রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২০, ০২:১৭ পূর্বাহ্ন

সংবাদ শিরোনাম :
টাঙ্গাইলে সিমেন্টের ট্রাক উল্টে বস্তার নিচে চাপা পড়ে ৬ যাত্রী নিহত মাস্ক না পরায় বয়স্কদের কান ধরানো যশোরের সেই সহকারী কমিশনার প্রত্যাহার কক্সবাজারে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত ৪ নতুন করে করোনার সংক্রমণ নেই, আরও চারজন সুস্থ: আইইডিসিআর করোনা চিকিৎসায় হাসপাতাল তৈরির ঘোষণার পর এলাকাবাসীর বিক্ষোভ-ভাঙচুর ছুটি চলাকালে মেয়াদোত্তীর্ণ যানের ফিটনেস নবায়নে জরিমানা মওকুফ ভেন্টিলেশন সুবিধার অভাবে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিশ্বে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর শতকরা ৭০ ভাগ ইউরোপে ভারতে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৮৭৩, মৃত ১৯ করোনাভাইরাস: বিশ্বনেতাদের কারা আক্রান্ত, কারা নন
ছিটমহল বিনিময়ের ৩ বছর: বদলে গেছে কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া

ছিটমহল বিনিময়ের ৩ বছর: বদলে গেছে কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়া

বি নিইজ : মাত্র ৩ বছর। খুব বেশী সময় নয়। এরইমধ্যে যেন ঘুচে গেছে ৬৮ বছরের বঞ্চনা। নিকষ অন্ধকারের বুকে জেগেছে আলোর বন্যা। ছিটমহল বিনিময়ের ৩ বছরের মাথায় ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো, প্রশস্ত মশৃন পাকা রাস্তা, ফায়ার সার্ভিস ষ্টেশন, সরকারি উদ্যোগে নির্মিত সৃদৃশ্য মসজিদ-মন্দির, বিটিসিএল অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে টেলিফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ, ডিজিটাল সেন্টার, স্কুল-কলেজ-এ যেন আলাদীনের চেরাগের ষ্পর্শে বদলে গেছে এক নতুন জনপদ দাসিয়ারছড়া। ১ আগস্ট ছিটমহল বিনিময়ের ৩ বছর পূর্তিতে প্রত্যাশার চেয়ে বেশী প্রাপ্তি থাকায় খুশি বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দারা। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের অধিবাসীরা ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের মূল ভূ-খন্ডের সঙ্গে মিশে গিয়ে তাদের ৬৮ বছরের অবরুদ্ধ জীবনের অবসান ঘটে। মূল ভূ-খন্ডে যুক্ত হওয়ার তিন বছরের মধ্যে বর্তমান সরকারের ব্যাপক হারে উন্নয়ন বঞ্চিত ছিটবাসীদের কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। এখন আর কোন অবরুদ্ধ জীবন নয়, স্বাধীনভাবে বাংলাদেশী নাগরিক হয়ে জীবন-যাপন করছে পুরো ছিটমহলবাসী। প্রতিটি পরিবারের ছেলে-মেয়ে স্থানীয় স্কুল-কলেজে পড়ার সুযোগ ছাড়াও দেশের বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ছে। অনেকেই বিভিন্ন সরকারি-বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনছে। এখন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যে সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, তার সবই পাচ্ছে সাবেক ছিটমহলের অধিবাসীরা। এলজিইডি সুত্রে জানা গেছে, গত দু’বছরে বিশেষ বরাদ্দ প্রায় ২২ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ হয়েছে দাসিয়ারছড়ায়। এর মধ্যে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন, ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এলজিইডির মাধ্যমে ২৪ কিলোমিটার পাকা রাস্তা তৈরী হয়েছে দাসিয়ারছড়ায়। ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে কালিররহাটে কমিউনিটি রির্সোস সেন্টার, ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫টি মসজিদ, ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি মন্দির, ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ব্রিজ, ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি হত দরিদ্র পরিবারের বসতবাড়ী নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে ভূমি জটিলতার বিষয়টি সম্পুর্ণ ভাবে নিরসন হয়ে গেছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন ১ হাজার ৬৪৩ দশমিক ৪৪ একর ও সরকারি খাস খতিয়ান ভুক্ত ৯ একর জমির প্রাক জরিপ শেষ করে খতিয়ান হস্তান্তর করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত কল্পে স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। দাসিয়ারছড়াসহ বিলুপ্ত ছিটমহলে বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তির ৭৫ দিনের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৫৬২ পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। এখন আর কোন বাড়িই নেই বিদ্যুৎ বিহীন। দেয়া হয়েছে দ্রুত গতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সরকারের সর্বোচ্চ মহল এখানকার সুবিধা অসুবিধার খোঁজ নিচ্ছেন। ডিজিটাল সাব সেন্টার থেকে স্বল্পমূল্যে দেয়া হচ্ছে তথ্য প্রযুক্তির সেবা। ইউনিসেফের অর্থায়নে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি স্থাপন করেছে ১৫ টি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র। এ ছাড়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে ১৪ টি মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কেন্দ্র। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অর্থায়নে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও কৃষি যন্ত্রপাতি দেয়া হয়েছে। দাসিয়ারছড়ায় ঘরে ঘরে সুপেয় পানি আর স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত হয়েছে। আত্বকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর বেকার যুব ও যুব মহিলাদের দেয়া হয়েছে নানা ট্রেডে প্রশিক্ষণ। দাসিয়ারছড়া বেসরকারি নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও স্কুল এ- কলেজসহ মোট ৬টি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এগুলো হলো দাসিয়ারছড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, দাসিয়ার ছড়া নি¤œ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, দাসিয়ারছড়া সমন্বয়পাড়া নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মইনুল হক নি¤œ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মিশকাত আইডিয়াল স্কুল এ- কলেজ ও ফজিলাতুন্নেছা দাখিল মাদ্রাসা। এই ৬ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দাসিয়ারছড়ার প্রায় ৭০০ জন ছাত্র-ছাত্রী পাঠদান করছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত না হওয়ায় কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে কিছুটা হতাশা বিরাজ করছে। দাসিয়ারছড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, জাকির হোসেন বলেন, ‘নিজের টাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছি। নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছি। কিন্তু বেতন-ভাতার খবর নেই।’ একই কথা বলেন, শেখ ফজিলাতুন্নেছা নি¤œ মাধ্যমিক দাখিল মাদ্রাসার সুপারিনটেন্ডেন্ট মো: আমিনুল ইসলামসহ কয়েকজন শিক্ষক। দাসিয়ারছড়ার সাবেক পঞ্চায়েত প্রধান নজরুল ইসলাম, আবদুল হাকিম, আবদুল জলিল, নুর আলম মাস্টার জানান, এখন তারা বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয় দিতে পেরে আনন্দিত ও গর্বিত। তবে সর্ববৃহৎ ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় প্রায় ৬ হাজার লোক বাস করলেও পৃথক ইউনিয়নের দাবী উপক্ষিত থেকেছে। ইউনিয়নের দাবীতে অনেক আন্দোলন করেও লাভ হয়নি। সংলগ্ন ৩টি ইউনিয়নের সাথে দাসিয়ারছড়াকে একিভূত করে দেয়া হয়েছে। এতে নিজেদের নেতা নির্বাচন করার অধিকার হারিয়েছেন তারা। ফলে তারা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হবার আশঙ্কায় আছেন। স্থানীয় কৃষক মানিক মিয়া বলেন, ‘হামার নিজের একটা ইউনিয়ন আর চেয়ারম্যান পাইলোং না।’ ছিটমহল আন্দোলনের নেতা গোলাম মোস্তফা খান বলেন, ‘আমাদের প্রাণের দাবী দাসিয়ারছড়া ইউনিয়ন ঘোষণা না হলেও যেভাবে উন্নয়ন কাজ তিন বছরে হয়েছে তাতেই আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।’ এ প্রসঙ্গে ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবেন্দ্র নাথ উরাঁও বলেন, ‘বিলুপ্ত ছিটমহলের অবরুদ্ধ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার বদ্ধপরিকর। এছাড়াও গত তিন বছরে বিলুপ্ত ছিটমহলে সরকারী ও বে-সরকারিভাবে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং উন্নয়নের কাজ চলতে থাকবে।’ এদিকে, ছিটমহল বিনিময়ের ৩ বছর পূর্তিতে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দারা। এর মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মোমবাতি প্রজ্জলন ও বঙ্গবুন্ধর প্রতিকৃতিত্বে পুস্পমাল্য অর্পন, প্রতিটি বাড়িতে আলোক সজ্জাসহ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ১৮ টি মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও ৩ টি মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 bnewsbd24.Com
Design & Developed BY Md Taher