মঙ্গলবার, ০২ মার্চ ২০২১, ০৯:১৯ পূর্বাহ্ন

বিপন্নতার পথে রবিদাস সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা “নাগরী”

বিপন্নতার পথে রবিদাস সম্প্রদায়ের মাতৃভাষা “নাগরী”

বি নিউজ পত্নীতলা, নওগাঁ : বাংলাদেশ বহু জাতিসত্তার বসবাসের একটি দেশ। বাংলাদেশ নামক উদীয়মান এই রাষ্ট্রটি আয়তনে ছোট হলেও জনসংখ্যা, ইতিহাস আর ঐতিহ্যে মোটেও ছোট নয়। প্রায় ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই ভূখন্ডে পঞ্চাশের ও অধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভিন্ন জাতিসত্তার বাস। এ সকল জাঁতি সত্তাসমুহের রয়েছে আলাদা আলাদা ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও প্রথা। যা বাংলাদেশের জন্য অপার গৌরব ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতার পরিচয় বহন করে চলেছে। বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমুহের মধ্যে রবিদাস সম্প্রদায়ের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। রবিদাস জনগোষ্ঠী দলিত শ্রেণীর আওতাভুক্ত। এদের ঐতিহ্যগত পেশা পাদুকা বা জুতা মেরামত। পেশাগত পরিচয়ে রবিদাস জনগোষ্ঠীর মানুষকে মুল ধারার মানুষরা মুচি হিসাবেই সম্বোধন করে থাকে। রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষরা নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে। হয়ত জীবণ আর জীবিকার প্রয়োজনেই বিচ্ছিন্ন বসবাস তাদের বাধ্য করেছে। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী নওগাঁ জেলায় ১ লাখ ১৬ হাজার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করলেও প্রকৃতপক্ষে জেলায় কি পরিমাণ রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করছে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মতো রবিদাস সম্প্রদায়েরও নিজস্ব মাতৃভাষা আছে। তাদের এই মাতৃভাষার নাম হলো “নাগরী”। প্রবীণ বা বয়স্ক রবিদাস কিছু নারী-পুরষ এই নাগরী ভাষা জানলেও তাঁরা এটি পরিবার বা পরিবারের বাহিরে চর্চা করছেন না। আর এ কারণে নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষা নাগরী বিষয়ে কিছুই জানছেন না। নিজেদের যে একটি ভাষা আছে সেটি বিষয়ে রবিদাস শিশুরা অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। নিজ মাতৃভাষার চর্চা না থাকায় দিন দিন সংকীর্ণ হয়ে পড়ছে নাগরী ভাষা চর্চা ও ব্যবহারের সুযোগ। আর এর মাধ্যমে বিলুপ্তিতার পথে এগিয়ে যাচ্ছে রবিদাস জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা “নাগরী”।
নওগাঁ জেলার মহাদেবপুর উপজেলার এনায়েতপুর ইউনিয়নের কালুশহর গ্রামে বাস করছে ৭টি রবিদাস পরিবার। কলোনীর মোট জনসংখ্যা ৩৫/৩৬জন। সম্প্রতি কালুশহর রবিদাস কলোনীতে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন নারী, পুরুষ ও ছাত্র-ছাত্রীর সাথে। ষাটোর্ধ শিবচরণ রবিদাস বলেন, তিনি ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশের চাকুরি করেছেন। এখন তিনি অবসরে। অবসর গ্রহণের পর কালুশহর বাজারে সুতা সেলাইয়ের কাজ করেন। প্রায় ১৫০ বছর পূর্বে তাঁদের পূর্বসূরীরা ভারত থেকে এখানে এসে বসতি গেড়েছেন। ছোট একটি জায়গায় পুকুর পাড়ে ৭টি পরিবার বর্তমানে গাদাগাদি করে বাস করছেন। জুতা সেলাই তাদের প্রধান পেশা হলেও ২/১ জন অন্য কাজে নিয়োজিত। আগে ছেলে-মেয়েরা স্কুলে না গেলেও বর্তমানে সকলেই স্কুলে যায়। কলোনি হতে বর্তমানে ৭জন ছেলে-মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে। জুতা সেলাই পেশায় আগের মতো আর আয় হয়না। মানুষ এখন সৌখিন হওয়ায় কেউ জোড়াতালি দেওয়া জুতা আর পড়তে চায় না। এখন নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা সঙ্গত কারণেই এই পেশাকে ছোট মনে করছে এবং অন্য পেশায় নিজেদের নিয়োজিত করছে। আগে পরিবারে তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলার সময় তাদের নিজেদের ভাষা নাগরীই ব্যবহার করতেন। কিন্তু পাড়ার প্রবীণ মানুষরা মারা যাওয়ার পর নাগরী ভাষার ব্যবহার কমে গেছে। এখন পরিবারেও আর নিজেদের ভাষা ব্যবহার করা হয়না। জোসনা রবিদাস নামে এক নারী জানান, নিজেদের ভাষায় আমরা কথা বলি এটা আমাদের ছেলে-মেয়েরা চায়না, তাঁরা এটাতে সংকোচ বোধ করে। তাই আমরাও আর নিজেদের ভাষা তেমন একটা ব্যবহার করি না। কলোনীতে ৪/৫জন আছে যারা নাগরী ভাষা কিছুটা বলতে পারে।
জাহাঙ্গীরপুর সরকারি কলেজ থেকে ২০২০ সালে এইচএসসি পাশ করা অনিমা রবিদাস জানান, পরিবার থেকে ছোটবেলা আমাকে নিজ ভাষা শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আমি বড় হয়ে ভেবেছি আমি ছোট জাঁতি নিজের ভাষা ব্যবহার করলে বন্ধু-বান্ধবরা আমার সাথে কিভাবে মেলামেশা করবে এটা ভেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও নিজেদের ভাষা ইচ্ছে করেই ব্যবহার করা হয়নি। কালুশহর উচ্চবিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর ছাত্র রজনী রবিদাস বলেন, এমনিতেই বাঙ্গালী সহপাঠিরা আমাদের নিচু জাঁতি হিসাবে গণ্য করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের ভাষা ব্যবহার তাঁরা কিভাবে নিবে এই সংকোচ থেকেই আমি কখনও নিজের ভাষা ব্যবহার করিনি। বরং নিজের ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেছি। তবে নিজ জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার স্বার্থে নিজেদের ভাষা ও সংস্তৃতির চর্চা অব্যাহত রাখা দরকার বলেও মনে করেন ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রবিদাস সম্প্রদায়ের এই শিক্ষার্থীরা।
বাংলাদেশ রবিদাস ফোরামের মহাদেবপুর উপজেলা শাখার সভাপতি বাবুলাল রবিদাস জানান, নওগাঁয় কি পরিমাণ রবিদাস জনগোষ্ঠী বাস করছে তাঁর সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা নেই। রবিদাস সম্প্রদায়ের সঠিক সংখ্যা নিরুপণ, ইতিহাস, ঐহিত্য ও ভাষা সংরক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ রবিদাস ফোরাম গঠন করা হয়েছে এবং কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
ভাষা হলো একটি জাতির অস্তিত্বের প্রতিক। ভিন্ন ভাষা-ভাষির মানুষ একটি রাষ্ট্রের অলংকার। কিন্তু প্রয়োজনীয় উদ্যোগের অভাবে বিলুপ্ততার পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা সুমহের ভাষা। নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষার বৈচেত্র্যতা অধরাই রয়ে যাচ্ছে। এভাবে যদি ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ভাষা বিলুপ্ত হতে থাকে তাহলে একসময় বাংলাদেশ থেকে বিপন্ন হয়ে যাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাষা। সেদিন বৈচিত্র্যতার বাংলাদেশ শব্দটি হয়তো আমরা আর ব্যবহারের সুযোগ পাবো না। পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙ্গলীরাই একমাত্র জাঁতি যারা মাতৃভাষার জন্য রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়েছিলো। এ কারণে বাংলা ভাষা বিশ্ব স্বীকৃতি লাভ করেছে। মায়ের ভাষার জন্য বাঙ্গালীর এই আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষায় রুপান্তরিত হয়েছে। যে দেশের মানুষ মাতৃভাষার দাবী প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বুকের রক্ত ঝরিয়েছে সে দেশেই ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমুহের ভাষার বিপন্নতা কখনও কাম্য হতে পারে না। তাই আসুন বাংলাদেশে বসবাসরত সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর নিজ মাতৃভাষা রক্ষায় আমরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করি। রক্ষা করি বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশের সুনাম।

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018-20
Design & Developed BY Md Taher