শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী ২০২১, ০৫:৪৭ পূর্বাহ্ন

বিনিয়োগ করতে না পারায় অতিরিক্ত তারল্য নিয়ে বিপাকে ব্যাংকিং খাত

বিনিয়োগ করতে না পারায় অতিরিক্ত তারল্য নিয়ে বিপাকে ব্যাংকিং খাত

বি নিউজ : করোনার প্রভাবে দেশে বিনিয়োগ কমে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে হুহু করে বাড়ছে অলস টাকা। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বা অলস টাকা দেড় লাখ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। নভেম্বর পর্যন্ত তা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায়। আর ডিসেম্বর শেষে তা আরো বেড়ে ২ লাখ কোটিতে পৌঁছাতে পারে। ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট তারল্যের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৭১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। তার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের হাতে ছিল ১ লাখ ১৫ হাজার ৮৮৩ কোটি, বিশেষায়িত ৩ ব্যাংকের হাতে ১ হাজার ৩১২ কোটি, বেসরকারি (কনভেনশনাল) ৩৪ ব্যাংকের হাতে ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৩৮ কোটি, ইসলামিক ৮ ব্যাংকের (বেসরকারি) হাতে ৪২ হাজার ৪৬২ কোটি এবং বিদেশি ৯ ব্যাংকের (বেসরকারি) হাতে রয়েছে ৩৩ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। তবে ব্যাংকিং নীতি অনুযায়ী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব ব্যাংকের ২ লাখ ২ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকার ন্যূনতম তরল অর্থ সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা ছিল। মোট তারল্য থেকে উল্লিখিত অঙ্ক বাদ দিলে যা থাকে তাই হলো অতিরিক্ত তারল্য বা অলস টাকা। ওই হিসাবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্য বা অলস অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, অতিরিক্ত তারল্যে ব্যাংকের পোর্টফোলিও বড় হলেও ব্যাংকের ভিত দুর্বল হচ্ছে। কারণ টাকার সংকট যেমন এক ধরনের বিপদ, তেমনি বিনিয়োগ করতে না পারা অতিরিক্ত তারল্যও সমান বিপদ বয়ে আনে। তবে কারো কারো মতে, এমন অবস্থা সাময়িক। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই বিনিয়োগ বাড়বে। তখন ব্যাংকগুলোতে আর টাকা অলস পড়ে থাকবে না। যদিও এক বছর আগেও বেশিরভাগ ব্যাংকই তীব্র তারল্য সংকটে ভুগছিল। বেসরকারি ব্যাংকগুলো নগদ জমা সংরক্ষণের হার (সিআরআর) ও সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ (এসএলআর) সংরক্ষণেই হিমশিম খাচ্ছিল। ব্যাংক কর্মকর্তারা তখন তারল্যের সংস্থান করতে বেশি সুদে অন্য ব্যাংকের আমানত বাগিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। কিন্তু করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাবে পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন ব্যাংকগুলোতে রীতিমতো অলস তারল্যের জোয়ার বইছে। তারল্য সংকটের কারণে এক বছর আগেও দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে খরা ছিল। এখন ব্যাংকগুলোতে তারল্যের জোয়ার বইলেও ঋণের চাহিদা নেই। আবার নতুন বিনিয়োগের জন্য আবেদন এলেও বাড়তি সতর্কতার কারণে ব্যাংকাররা এ মুহূর্তে ঋণ দিতে চাইছে না। ফলে অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ।
সূত্র আরো জানায়, করোনা মহামারীতে সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বেসরকারি খাতে অর্ধলাখ কোটি টাকারও বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে। করোনায় বড় ধাক্কা খাওয়া দেশের আমদানি খাত এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় জুলাই-অক্টোবর সময়ে আমদানি কমেছে ১২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। যদিও সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা দেশের ব্যাংক খাতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ অলস তারল্য। আর অতিরিক্ত তারল্যের চাপ সামলাতে ব্যাংকগুলো আমানতের সুদহার সর্বনিম্নে নামিয়ে এনেছে। এক বছর আগেও যেখানে কোনো কোনো ব্যাংক ৮ শতাংশের বেশি সুদে ৩-৬ মাস মেয়াদি আমানত সংগ্রহ করেছে, এখন তা ৩-৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। তারপরও অতিরিক্ত তারল্যের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যাংকারদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে ব্যাংক আমানতের গড় সুদহার ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিস্থিতি যা তাতে বিনিয়োগ বা ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে না পারলে অচিরেই ব্যাংক আমানতের সুদহার ১-২ শতাংশে নেমে আসবে।
এদিকে এ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড় সৃষ্টি হওয়ায়ই স্বাভাবিক। কারণ যে ঋণ দেয়া হয়েছে তা ফেরত আসছে না। পাশাপাশি ঋণ বিতরণেও এখন ব্যাংকাররা ভীষণ চিন্তিত এবং সতর্ক। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে বিনিয়োগ নেই। আমদানিও অপর্যাপ্ত। নতুন কোনো শিল্পকারখানা গড়ে উঠছে না। তাই ভালো গ্রাহক ঋণ নিতে চাইছে না। উল্টো দাগী ঋণখেলাপিরা নতুন করে ঋণ চাইছে। না দিলে কেউ কেউ হুমকিও দিচ্ছে। আর তা নিয়ে ব্যাংকাররা বড় বেকায়দায় পড়েছে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ব্যাংক এশিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আরফান আলী জানান, করোনায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। ফলে তারল্য জমছে। তবে এটা সাময়িক। করোনা পরিস্থিতি আরো স্বাভাবিক হলে বিশেষ করে ভ্যাকসিন এলে মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসবে। তখন বিনিয়োগও বাড়বে। আর বিনিয়োগ বাড়লে তারল্যও কমে যাবে।
এ প্রসঙ্গে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী জানান, করোনার কারণে সাময়িক অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে। তবে এ তারল্য থাকবে না। ডিসেম্বর থেকে মার্চ ও জুনের মধ্যেই তারল্য ফুরিয়ে যাবে। কারণ মার্চে অনেক ডেফার্ড এলসির মেয়াদ শেষ হবে। তখন এলসির দায় পরিশোধ করতে প্রচুর মুদ্রা লাগবে। তাছাড়া এখন কলকারখানার চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে আরো সচল হবে। তখন এমন পরিস্থিতি আর বিরাজ করবে না।

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018-20
Design & Developed BY Md Taher