বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২১, ০৬:১৯ অপরাহ্ন

শিরোনাম ::
জিনোম গবেষণা : সিএনএনের প্রতিবেদন নিয়ে বিসিএসআইআর’র সংবাদ সম্মেলন জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামে পেপার মিলে দুর্ঘটনায় শ্রমিক নিহত গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে পিকে হালদারের বান্ধবী অবন্তিকা দুর্নীতির জন্য বেশি দামে ভ্যাকসিন আমদানি : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর করোনায় আরও ১৪ মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ৮৯০ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান রেলওয়ের অনুমতি না নিয়েই গড়ে তুলেছে সহস্রাধিক লেভেল ক্রসিং ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভয়ংকর ঝুঁকি তৈরি করছে টিমওয়ার্ক দুর্নীতি হয়, তবে ব্যক্তিগত দুর্নীতি বেশি: পরিকল্পনামন্ত্রী ভর্তি ও টিউশন ফি আদায়ে অনেক স্কুলই মাউশির নির্দেশনা মানছে না
কঠিন হবে বাইডেনের চলার পথ -বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

কঠিন হবে বাইডেনের চলার পথ -বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী

আগামী ২০ জানুয়ারি শপথ গ্রহণের পর জো বাইডেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ২০২০ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেট প্রার্থী বাইডেন ৩০৬টি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৩২টি ইলেকটোরাল ভোট অর্জন করেছেন, বিজয়ের জন্য যেখানে দরকার ২৭০ ভোট। বাইডেন সর্বমোট জনপ্রিয় ভোট পেয়েছেন ৮০ কোটি ৯৫ লাখ ২ হাজার ৭৯৬ ভোট। আর ট্রাম্প পেয়েছেন ৭৪ কোটি ৮৩ হাজার ৯১১ ভোট। নির্বাচনের পূর্বে যেসব লেখা লিখেছিলাম তাতে অনায়াসে বলেছিলাম যে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন। এটা কলামিস্টদের কোনও বুজুর্গি নয়, কোভিড-১৯ মোকাবিলায় ব্যর্থ একজন প্রেসিডেন্ট যে পরবর্তী নির্বাচনে জিততে পারবে না তা তো অবধারিত সত্য। কিন্তু নির্বাচনের পরে দেখা গেছে বর্ণবাদ এত মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল যে কোভিড-১৯ সামাল দেওয়ার ব্যর্থতার কারণে সামান্য ভোট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গেছে। কয়েকটি রাজ্যে দু’প্রার্থীর ভোট ব্যবধান দশমিকের নিচে আছে।
অবশ্য ট্রাম্প কোভিড-১৯-এর ভুল এর মাশুল দিতে গিয়ে কষ্টও কম করেননি। মানুষের মন ফেরানোর জন্য হাজার হাজার অনুদানের চেক তিনি নিজেই দস্তখত করেছিলেন। যা হোক, চার বছরের নানা নেতিবাচক কাজ আর কোভিড ব্যর্থতা এত ব্যাপক যে ট্রাম্প তা পরবর্তী কর্মকা- দিয়ে ঢাকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত পরাজিতই হয়েছেন।
জো বাইডেন খুবই অভিজ্ঞ লোক। তিনি ৩৬ বছর সিনেটর ছিলেন। ৮ বছর সিনেটের ফরেন রিলেশনস বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। আবার ২ দফায় মোট ৮ বছর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এত পদে থেকে কেউ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কখনও হননি। কিন্তু তিনি দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছেন এমন এক স্বেচ্ছাচারী লোকের হাত থেকে, যিনি মনের খুশিতে প্রেসিডেন্টর পদে বসে যা ইচ্ছে তা করেছেন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন দায়িত্ব বুঝে নিয়ে যাত্রা করবেন এক কঠিন পথে।
ট্রাম্প তার চার বছর মেয়াদকালে বিশ্ব ব্যবস্থার বিভিন্ন সংস্থা থেকে আমেরিকার সদস্যপদ প্রত্যাহার করেছে। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতীয় নেতৃবৃন্দ যারা বিশ্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন ছিলেন, তারা প্রয়োজনীয় সংস্থা গঠন করে বিশ্বকে সম্মিলিত উদোগের দিকে টেনে এনেছেন এবং বিশ্বে এক সম্মিলিত ও সমন্বিত বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার চার বছর মেয়াদকালে বিশ্ব ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়ে বিশ্বে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে প্রয়াস চালিয়েছিলেন।
এ কথা সত্য যে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থার প্রধান অর্থ-জোগানদাতা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। তারা জাতিসংঘের খরচ নির্বাহের ২৪ শতাংশ সরবরাহ করে থাকে। আবার তার বিনিময় যে কিছু নেই তা নয়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৩ সালে বিশ্ব-অর্থ ব্যবস্থায় আমেরিকান মুদ্রা ডলারকে বিনিময়ের মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যা এখনও অব্যাহত আছে। যেকোনও দেশের যেকোনও ব্যাংক একটা লেটার অব ক্রেডিটকে কার্যকর করতে আমেরিকান যেকোনও একটা ব্যাংকের এনডোর্সমেন্ট প্রয়োজন হয়। এ কাগুজি কাজটার জন্য আমেরিকাকে কমিশন দিতে হয়। এখন আমেরিকার আয়ের অন্যতম উৎস হচ্ছে সেই কমিশন।
আমি সাধারণ মানুষ, সুতরাং কথা বলতে সংযত হওয়া উচিত। আমি দেখেছি গত ২০/২৫ বছরব্যাপী আমেরিকার বাণিজ্য বিভাগ নব নব আয়ের উৎস উন্মুক্ত করতে তেমন সফল কাম হয়নি। তাদের অস্ত্রের দাম বেশি, তাদের গাড়ির দাম বেশি; তারা প্রতিযোগিতায় চীন আর জাপানের সঙ্গে পেরে উঠছে না। এখন বিনিময় মুদ্রা হিসাবে ডলারের কমিশনটা বন্ধ হলে আমেরিকার অর্থ ব্যবস্থার ত্রাহি মধুসূদন রব উঠবে। এখন বাইডেনকে আর্থিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে হলে নব নব আয়ের উৎস খুঁজে বের করতে হবে।
ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথমে সৌদি আরব সফর করেছিলেন। তখন ট্রাম্প ৮ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র সৌদি আরবের কাছে পুশিং সেল দিয়েছিলেন। এখন তার যাওয়ার সময় নির্বাচনের পূর্বে তিনি যুদ্ধবিমান বিক্রি করেছেন বাহরাইন আর সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে। মধ্যপ্রাচ্যের আমির শাসিত রাষ্ট্রগুলো পালের গোদার মতো। তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আমেরিকার মন জুগিয়ে চলতে হয়। সুতরাং তাদের মনের অভিলাষ পূর্ণ করার জন্য যখন যা বলে তা শুনতে হয়। না হয় আমেরিকার বিমানের চেয়ে ফ্রান্সের রাফায়েল যুদ্ধ বিমান অনেক সস্তা এবং উন্নত কিন্তু প্রভুর মন-রক্ষার জন্য সেদিকে চোখ ফেরানো যাবে না। জোর করে তারা ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রগুলোর কাছে অনুরূপভাবে মালামাল বিক্রি করে।
বাইডেনকে ক্ষমতা গ্রহণের পর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। ইয়েমেন-সৌদি যুদ্ধ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধের প্রতি এতদিন ট্রাম্পের একতরফা দৃষ্টি ছিল। ডেমোক্র্যাটরা যখনই ক্ষমতায় এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি তারা মনোযোগ দিয়েছে। ইরানের সঙ্গে বিরোধ মেটাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ফেব্রুয়ারির মধ্যে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক মূল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে ইরান তার দেশে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরিদর্শন কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিকে ক্ষমতা দিয়ে একটি বিলকে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের বিরোধের ব্যাপারে ডেমোক্রেট দলের আন্তরিক প্রচেষ্টা ছিল। দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক একটা সমাধান বের করে আনার চেষ্টা করে গেছেন কার্টার, ক্লিনটন এবং ওবামা। দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিষয় কিছু উন্নতিও ছিল কিন্তু ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এক রাষ্ট্রের কাঠামোতে সমাধানের মনোভাব পোষণ করায় পরিস্থিতি বদল হয়ে গেছে। ট্রাম্প ইসরায়েলের অনুকূলে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহারাইনের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এবং সফলকামও হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং গোপন বৈঠকও হয়েছে। সৌদি আরব ইসরায়েলকে তার আকাশ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টা চূড়ান্ত বলে মনে হয়।
জো বাইডেন ২০ জানুয়ারি ২০২১ আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয় নিয়ে কীভাবে অগ্রসর হয় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ট্রাম্প কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টা চূড়ান্ত করে এক রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে সহজ করে তোলার চেষ্টা করেছিল। পূর্বে ডেমোক্র্যাটেরা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারা দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের চেষ্টা করেছিল। বাইডেনের সামনে এখন ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের পথ দু’টি দৃশ্যমান হয়েছে, এক রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে এবং দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান। সুতরাং ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান এখন কিছুটা জটিল আকার ধারণ করেছে। বাইডেন এ সমস্যা নিয়ে কিছু করতে চাইলে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হবেন।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018-20
Design & Developed BY Md Taher