সোমবার, ২৩ নভেম্বর ২০২০, ০১:০২ অপরাহ্ন

শিরোনাম ::
করোনায় আরও ৩৮ জনের মৃত্যু, শনাক্ত ২০৬০ অর্থ পাচারকারীরা দেশ ও জাতির সঙ্গে বেইমানি করছে: হাইকোর্ট প্রজেক্ট বিল্ডার্স এমডি-পরিচালকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ব্যাংকে ফের সাইবার হামলার শঙ্কা, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে সতর্কতা জারি প্রতিষ্ঠার ১৬ বছরেও নির্বাচন হয়নি যে পৌরসভায় যোগাযোগে ‘ব্যাপক নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলায় অর্থনীতির চাকা সচল: প্রধানমন্ত্রী মূর্তি বা ভাস্কর্য মানেই শিরকের উপকরণ নয়: মাওলানা জিয়াউল দুষ্কৃতিকারীদের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে কমলাপুর আইসিডি বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানিকৃত টন টন পেঁয়াজে পচন ধরায় মোটা লোকসানে আমদানিকারকরা বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ এবার হচ্ছে না
পরিবেশের ক্ষতিকে গুরুত্ব না দিয়েই দেশের শিপইয়ার্ডগুলোয় ভাঙ্গা হচ্ছে অয়েল ট্যাংকার

পরিবেশের ক্ষতিকে গুরুত্ব না দিয়েই দেশের শিপইয়ার্ডগুলোয় ভাঙ্গা হচ্ছে অয়েল ট্যাংকার

বি নিউজ : পরিবেশের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব না দিয়েই দেশে চট্টগ্রামের শিপইয়ার্ডগুলোতে পুরনো অয়েল ট্যাংকার পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ করা হচ্ছে। বলতে এখন জাহাজ ভাঙ্গার শিপইয়ার্ডগুলো বিদেশী পুরনো অয়েল ট্যাংকারের ডাম্পিং স্টেশনে পরিণত হয়েছে। ওসব অয়েল ট্যাংকারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পরিবাহিত জ্বালানি তেলের বর্জ্য বা গাদ, অ্যাসবেসটস ও পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইল (পিসিবি) থাকে। যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত ও ক্ষতিকর। দেশে পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে খুব একটা কড়াকড়ি না থাকায় শিপইয়ার্ডগুলোতে অন্যান্য জাহাজের সঙ্গে অয়েল ট্যাংকারও আসছে। আর লাভজনক হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকগুলো ইয়ার্ড গড়ে ওঠে। সেখানে এ খাতের ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে নানা ধরনের পুরনো জাহাজ এনে ভাঙতে থাকে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ক্লার্কসন্স রিসার্চের গবেষণা মতে, জাহাজ ভাঙায় বাংলাদেশ বিশ্বের এক নম্বর দেশে পরিণত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বের ৬৪ শতাংশ অয়েল ট্যাংকার এখন বাংলাদেশেই পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। যে কারণে গবেষণা প্রতিবেদনগুলোতে ভারত, বাংলাদেশ বা পরিবেশগতভাবে নাজুক অবস্থানে থাকা অন্যান্য এশীয় দেশে অয়েল ট্যাংকার ভাঙতে না পাঠানোর সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু ওসব সুপারিশ উপেক্ষা করে বাংলাদেশে ভাঙা অয়েল ট্যাংকারগুলো থেকে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত উপাদানে বায়ু ও পানি দূষিত হচ্ছে। ওসব জাহাজে থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান অ্যাসবেসটস নিঃশ্বাসের সঙ্গে শরীরে ঈস্খবেশ করলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেকখানি বেড়ে যায়। পাশাপাশি আশপাশের জীববৈচিত্র্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় জাহাজ ভাঙার কারণে সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বনাঞ্চলও পরিবেশ দূষিত হয়ে নাজুক অবস্থানে পড়েছে। একই সঙ্গে তা সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে জেলেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশবিদ এবং জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বের অনেক দেশই জাহাজ ভাঙার মতো ঝুঁকির কাজ থেকে সরে এলেও বাংলাদেশে অযৌক্তিকভাবে এ কাজকে শিল্পে পরিণত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিদেশীরা তাদের পুরনো জাহাজ আর কোথাও পাঠাতে পারে না বলে বাংলাদেশে পাঠায়। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কেও পুরনো জাহাজ ভেঙে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়। ওই চারটি দেশসহ পুরো বিশ্বে ২০১৯ সালে ১ কোটি ২২ লাখ ১৮ হাজার গ্রস টন পুরনো জাহাজ বিক্রি হয়েছে। যার মধ্যে ৬৬ লাখ ৮২ হাজার গ্রস টন বা প্রায় ৫৫ শতাংশই বাংলাদেশে এসেছে।
আগে তা পাকিস্তানে পুরনো অয়েল ট্যাংকা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করতে পাঠানো হলেও এখন তা প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আর গত বছর থেকে চীনও বিদেশী অয়েল ট্যাংকার পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নিচ্ছে না। মূলত বাংলাদেশে যতো ইস্পাতের কাঁচামাল প্রয়োজন তার বেশির ভাগই আমদানি করা বিলেট থেকে আসে।
সূত্র জানায়, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের লক্ষ্যে বাংলাদেশে একটা সময় শুধু অয়েল ট্যাংকারই আসতো। তবে এখন প্রায় সব ধরনের জাহাজই আসে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসে বাল্ক ক্যারিয়ার ও অয়েল ট্যাংকার। প্রয়োজনীয় সরকারি পরিদর্শন সাপেক্ষেই অয়েল ট্যাংকারগুলো ইয়ার্ডে নিয়ে আসার অনুমতি দেয়া হয়। করোনার প্রভাবে সাময়িকভাবে দেশে পুরনো জাহাজের প্রবাহ কিছুটা কমলেও এখন ত্ আসছে। বাংলাদেশে ভাঙার জন্য আনা জাহাজগুলোর মধ্যে অয়েল ট্যাংকার ছাড়াও রয়েছে বাল্ক ক্যারিয়ার, কেমিক্যাল ট্যাংকারস, কনটেইনার শিপস, ফেরিজ অ্যান্ড প্যাসেঞ্জার শিপস, জেনারেল কার্গো শিপস, লিকুইফায়েড গ্যাস ক্যারিয়ারস, অফশোর ভেসেলস ও অন্যান্য। ক্লার্কসন্স রিসার্চের তথ্য মতে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া জাহাজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল বাল্ক ক্যারিয়ার, যার পরিমাণ ৩৪ লাখ ২৬ হাজার গ্রস টন। তাছাড়া কনটেইনার শিপ ছিল ১০ লাখ ১৫ হাজার গ্রস টন আর অয়েল ট্যাংকার ছিল ১২ লাখ ৭১ হাজার গ্রস টন, যা বিশ্বের সব দেশে বিক্রি হওয়া পুরনো অয়েল ট্যাংকারের ৬৪ শতাংশ। ওই হিসাবে বাংলাদেশে বিশ্বের ৬৪ শতাংশ অয়েল ট্যাংকারই পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হয়। যদিও দাবি করা হচ্ছে ইয়ার্ডগুলো কর্মপরিবেশ ও শ্রম সুরক্ষা বজায় রেখেই পুরনো জাহাজা পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণে সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৬০টি জাহাজ ভাঙার ইয়ার্ড রয়েছে। তার মধ্যে ৫০-৬০টি সচল আছে। ওসব ইয়ার্ডে কাজ করে ২০ হাজারেরও বেশি শ্রমিক। জাহাজ সৈকতায়নের পরই ইয়ার্ডে কর্মতৎপরতা শুরু হয়। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভাবে এ কাজে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি অরক্ষিত ব্যবস্থায় ইয়ার্ডের শ্রমিকরাও নিরাপত্তাহীনভাবে কাজ করছে। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে বছরে গড়ে ১৮ জন জাহাজ ভাঙা শ্রমিক ইয়ার্ডেই মারা যায়। যদিও দেশে বিগত ২০১৮ সালে বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ আইন প্রণয়ন হয়। ওই আইনের আওতায় একটি বোর্ড গঠনের কথা রয়েছে। কিন্তু আইন প্রণয়নের দুই বছরেও কোনো বোর্ড গঠন করা হয়নি।
এদিকে বিশ্বের আর কোনো দেশ এভাবে লোহা ভাঙে না। বিশ্বব্যাংকের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ৮০ হাজার টন অ্যাজবেসটস আসবে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে জাহাজ ভাঙা শিল্পের এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিক অ্যাজবেসটসিসে আক্রান্ত বলে শনাক্ত হয়েছে। এক ফোঁটা অ্যাজবেসটস মানুষের নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে গেলে ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে ওই ৮০ হাজার টনের দায়িত্ব কে নেবে বিশেষজ্ঞরা সে প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আবু তাহেরের মতে, যথাযথ অনুমোদন নিয়েই পুরনো জাহাজ ইয়ার্ডে এনে ভাঙার কাজ করা হয়। শিল্প হিসেবে এ কাজটি বিকশিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। কর্মপরিবেশ ও শ্রমসংক্রান্ত সার্বিক কমপ্লায়েন্স বজায় রেখেই জাহাজ ভাঙা হচ্ছে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, ভারতে জাহাজ সৈকতে ভেড়ানোর আগে ট্যাংকার মুক্ত করে নেয়ার নির্দেশনা আছে। বাংলাদেশের আদালতও একই কথা বলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের আদালতের নির্দেশনার পরও অয়েল ট্যাংকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তাছাড়া অন্যান্য জাহাজ গ্যাসমুক্ত করা গেলেও অয়েল ট্যাংকার কখনোই গ্যাসমুক্ত করা যায় না। ফলে এতে পরিবেশের ক্ষতি হয় বেশি।
এ প্রসঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শিবনাথ রায় জানান, করোনার মধ্যে সার্বিক পরিদর্শন কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। শুধু জাহাজ ভাঙা শিল্পের জন্যই পরিদর্শক সুনির্দিষ্ট করা আছে, যারা সার্বিক কমপ্লায়েন্সের বিষয়গুলো নিশ্চিত করে। সাম্প্রতিক সময়ে খুব নেতিবাচক কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। দুই-তিন মাসে হতাহতের ঘটনাও তেমন ঘটেনি। জাহাজ ভাঙার সার্বিক বিষয়গুলো দেখার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ও কাজ করছে। এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্পও ছিল। প্রকল্পের আওতায় অয়েল ট্যাংকার ভাঙার আগে কী কী সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া দরকার, চেম্বার, গ্যাস সিলিন্ডার রিলিজ করা এ বিষয়গুলো নজরদারি করছে।

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018-20
Design & Developed BY Md Taher