সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০৮:২৬ অপরাহ্ন

অর্থঋণ আদালতের বিপুল মামলায় ঝুলে রয়েছে লক্ষাধিক কোটি টাকা

অর্থঋণ আদালতের বিপুল মামলায় ঝুলে রয়েছে লক্ষাধিক কোটি টাকা

বি নিউজ : অর্থঋণ আদালতে হাজার হাজার মামলা আটকে রয়েছে। তাতে ঝুলে রয়েছে লক্ষাধিক কোটি টাকা। মূলত খেলাপি ঋণসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যই অর্থঋণ আদালত চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে ওই আদালতেই আটকে আছে ৬৪ হাজার ৮৩২টি মামলা। আর ওসব মামলায় ঝুলে রয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। বিগত ২০০৩ সালে অর্থঋণ আদালত গঠন হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ওই আদালতে মামলা হয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার ১২১টি। আর ওসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। যদিও অর্থঋণ গত জুন পর্যন্ত ১ লাখ ২৭ হাজার ২৮৯টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। কিন্তু নিষ্পত্তীকৃত মামলার অর্থের অর্ধেক ঋণও ব্যাংকগুলো আদায় করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত ব্যাংকের দাবির বিপরীতে মাত্র ১৮ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা আদায় সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে দাবিকৃত মোট অর্থের মধ্যে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ আদায় করা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের ফাস্টট্র্যাক আইন হিসেবে ২০০৩ সালে অর্থঋণ আদালতের যাত্রা শুরু। ওই আইনের কার্যকারিতাকে দেশের অন্য সব আইনের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই অর্থঋণ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো বহু গুণ বেড়ে গেছে। মহামারী থেকে দেশের ঋণগ্রহীতাদের সুরক্ষা দিতে চলতি বছর ঋণখেলাপি হওয়ার পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। তারপরও জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। একই সময়ে অবলোপন করা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। অথচ এক দশক আগেও ২০০৯ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রায় সব ধাপেই সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। যদিও দেশের বিভিন্ন অর্থঋণ আদালতে এখনো ২০০৪ সালে দায়েরকৃত মামলাও চলছে। বিগত ২০০৪ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক চট্টগ্রামের সালেহ গ্রুপের সালেহ কার্পেট মিল, সালেহ জুট মিল, সালেহ জরিনা রুলিং মিলসহ ৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২৫৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৬ বছরেও এ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আদালতে এখনো মামলাটি চলমান রয়েছে। শুধুমাত্র চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতেই মামলা রয়েছে প্রায় ৫ হাজার। আর ওসব মামলার অর্ধেকের বয়সই ৫ বছরের বেশি। তাছাড়া অর্থঋণ আদালতগুলোর মধ্যে ঢাকার ৪টি আদালতেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৫ হাজার ৫৯১টি। তার মধ্যে অর্থঋণসংক্রান্ত মূল মামলা ৭ হাজার ৯৭৬টি। আর অর্থ জারি মামলার সংখ্যা ১৭ হাজার ২৮১ এবং মিস কেস ৩৩৪টি। বিপুল এ মামলার চাপে হিমশিম খাচ্ছেন ঢাকার অর্থঋণ আদালত। আবার দীর্ঘদিনেও নিষ্পত্তি হচ্ছে না এসব আদালতে দায়েরকৃত মামলা।
সূত্র জানায়, আইন অনুযায়ী দেশের সব জেলায় অর্থঋণ আদালত থাকার কথা। তবে সারা দেশে কেবল অর্থঋণ বিষয়ের ওপর বিচার করে এ ধরনের আদালতের সংখ্যা বর্তমানে মাত্র ১১টি। যেসব জেলায় অর্থঋণ আদালত নেই, সেখানে যুগ্ম জেলা জজ আদালত একই সঙ্গে ফৌজদারি, দেওয়ানি ও অর্থঋণ মামলার বিচার পরিচালনা করেন। তাতে অর্থঋণ আদালতের পাশাপাশি অন্য আদালতের বিচার কাজেও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টের অধীনে ব্যাংকগুলো চেক ডিজঅনার মামলা করছে। আর ফৌজদারি আদালতে ওসব মামলা দায়ের করা হচ্ছে। বিপুল খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রতিনিয়ত ফৌজদারি আদালতে চেক ডিজঅনারের মামলা বাড়ছে। তাতে খেলাপি ঋণ আদায়ের দেওয়ানি মামলাও ফৌজদারি মামলায় রূপান্তর হচ্ছে। ফলে খুন, ধর্ষণ, চুরি-ডাকাতির মতো জঘন্য সামাজিক অপরাধগুলোর বিচারপ্রক্রিয়াও দীর্ঘসূত্রতার মুখে পড়ছে।
সূত্র আরো জানায়, চাহিদার তুলনায় দেশে অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা কম। একই সঙ্গে আদালতগুলোর বিচারক সংখ্যাও যথেষ্ট নয়। নানা কারণে অর্থঋণ আদালতের মামলা জট তৈরি হচ্ছে। ফলে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকারদের হয়রানি বাড়ছে। মামলা ঝুলে থাকায় গ্রাহকরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের ব্যাংকিং খাতকে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে হলে দ্রুতগতিতে বিচার নিষ্পত্তি করা জরুরি। দেশের ব্যাংকারদের অভিযোগ, অর্থঋণ আদালতের দীর্ঘসূত্রতা খেলাপি ঋণ আদায়ে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেজন্যই ব্যাংকাররা আদালতের কার্যক্রমে গতি আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয়ে কয়েক দফায় অনুরোধও জানিয়েছে। কিন্তু তাতেও মামলা নিষ্পত্তিতে গতি না এসে বরং উল্টো অর্থঋণ আদালতের কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসছে বলে ব্যাংকাররা অভিযোগ তুলেছেন। তাদের মতে, দেশের ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান সংকট ও সমস্যাগুলোর সমাধান করা কঠিন কোনো কাজ নয়। সেজন্য সব পক্ষের আন্তরিকতা থাকতে হবে। পাশাপাশি ভালো আইন বানানোর সাথে আইনের বাস্তবায়ন ঘটানোও জরুরি। কিছু চিহ্নিত ঋণখেলাপি ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। আবার অর্থঋণ আদালতসহ কোনো আদালতই তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারছেন না। এ সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে কোনো আইনই কার্যকর বলে প্রমাণিত হবে না।
এদিকে অর্থঋণ আদালতে দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রিতা বিষয়ে আইনজীবীরা জানান, অর্থঋণ আদালত দেশের ফাস্টট্র্যাক আইন। এ বিবেচনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অর্থঋণ আদালতের মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু এ আদালতের দীর্ঘসূত্রতায় আইনজীবী হিসেবে আমরাও হতাশ। নানা কৌশলে অর্থঋণ আদালতের মামলা নিষ্পত্তি দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলা চলাকালেই ব্যাংকের সঙ্গে ঋণখেলাপিদের সমঝোতা হয়ে যায়। কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকাররাই চান না মামলা নিষ্পত্তি হোক। খেলাপি হওয়া ঋণ বিতরণে অনিয়মের সঙ্গে ব্যাংকাররা জড়িত থাকেন। আবার অর্থঋণ আদালতে দায়েরকৃত মামলার বিরুদ্ধে হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ দেয়া হচ্ছে। বড় ঋণখেলাপিদের মামলার নিষ্পত্তি ঠেকাতে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করা হচ্ছে। আদালত ও বিচারকের স্বল্পতাও অর্থঋণ আদালতকে দীর্ঘসূত্রতায় ঠেলে দিচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিয়াক), যা আরবিট্রেশন ও মেডিয়েশনের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করে থাকে। মামলা জট কমাতে সারা বিশ্বে আর্থিক বিরোধসংক্রান্ত মামলার ৯০ শতাংশই আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হচ্ছে বলে জানান বিয়াকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ এ (রুমি) আলী। তিনি জানান, সারা বিশ্বে কমার্শিয়াল বিরোধের ৯০ শতাংশ নেগোশিয়েশন, মেডিয়েশন ও আরবিট্রেশনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে। কিন্তু এদেশে সব বিরোধই আদালতে চলে যাচ্ছে। তাছাড়া এদেশের আরবিট্রেশন-সংক্রান্ত আইনের সীমাবদ্ধতা আছে। ইউরোপ-আমেরিকায় আরবিট্রেশনের দায়িত্ব পালনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকার অর্থ দেয়। কিন্তু এদেশের সরকার এ ধরনের কোনো সহায়তা দিচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিয়াকের মতো প্রতিষ্ঠান চালানো খুবই কঠিন। কারণ এখানে কোনো মামলা আসছে না। সেজন্য সরকার বিয়াকের মতো আরো ৫টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে গড়ে ওঠার আইনি ও আর্থিক সহায়তা দেয়া জরুরি। তাহলে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ আদায়সহ আর্থিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
অর্থঋণ আদালতের মামলার দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ আমিন উদ্দিন জানান, অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে এত দীর্ঘসূত্রতা হচ্ছে কেন বুঝতে পারছি না। অর্থঋণ আদালতে মামলা নিষ্পত্তিতে যদি সাধারণ আদালতের মতোই সময় লাগে, তাহলে এ আইনের স্বতন্ত্রতা থাকে না। কারণ ব্যাংকের পক্ষে অর্থঋণ আদালতের প্রতিটি ধারা। তারপরও ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া ও অর্থ আদায় না হওয়া দুঃখজনক। ব্যাংকগুলো অর্থঋণ আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য যেসব আইনজীবী নিয়োগ দেন তারা চাইলে দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তাছাড়া খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকারদেরই সবার আগে সতর্ক হওয়া দরকার। ব্যাংকাররা যথাযথ রীতিনীতি মেনে ঋণ দিলে খেলাপি ঋণ এত বেশি হতো না। অনেক সময় ব্যাংকগুলো ১ লাখ টাকার জামানতের ভ্যালুয়েশন ৫ লাখ টাকা দেখান। ফলে জামানতের সম্পদ নিলামে তুলে ১ লাখ টাকাও বিক্রি করতে পারে না। এ পরিস্থিতি থেকে বেরোতে হলে ব্যাংকারদের সবার আগে সংশোধন হতে হবে।

শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2018-20
Design & Developed BY Md Taher