শনিবার, ২৩ নভেম্বর ২০১৯, ০২:৪৯ পূর্বাহ্ন

কৃষি জমি নষ্ট করে শিল্প-কারখানা নয়: প্রধানমন্ত্রী

কৃষি জমি নষ্ট করে শিল্প-কারখানা নয়: প্রধানমন্ত্রী

বি নিউজ : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের প্রয়োজনে আমরা শিল্পায়ন করবো, তবে কৃষিকে ত্যাগ করে নয়। কৃষিকে সঙ্গে নিয়ে শিল্পায়ন করতে হবে। কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ খাদ্য ও পুষ্টির মাধ্যমে কৃষি এবং কৃষক আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। আজ বুধবার দুপুরে রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী কৃষক লীগের দশম জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষকের অধিকার রক্ষা করাই আওয়ামী লীগ সরকারে লক্ষ্য। কৃষকের কল্যাণে আমরা ক্ষমতায় আসার পর নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। যার ফলশ্রুতিতে কৃষি উৎপাদন বেড়েছে। আজ দেশ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কারো কাছে খাদ্যের জন্য হাত পাততে হয় না। কৃষিজমি রক্ষা করে কল-কারখানা স্থাপনের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যত্রতত্র কল-কারখানা করা যাবে না। তিন ফসলি জমিতে কখনই না। আমাদের কৃষিজমি বাঁচাতে হবে, মানুষকে খাওয়াতে হবে। ধান কাটা, ধানের চারা রোপণ করা, জমি চাষ-কৃষির সবকিছুকে যান্ত্রিকীকরণ করতে চাইবো এবং সেই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছি। তবে তা অবশ্যই কৃষিজমি রক্ষা করে। কৃষির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কৃষিকে গুরুত্ব দিই। ভবিষ্যতেও কৃষির উন্নয়নে যা যা করণীয় সবই করা হবে। কৃষিতে ভর্তুকির ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকসহ বিদেশি দাতা সংস্থার বাধা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তাদের বলেছি, আপনাদের টাকা লাগবে না, নিজের টাকা কৃষিতে ভর্তুকি দিবো। সবকিছুতে সবসময় লাভ দেখলে হয় না, দেশের মানুষ কিসে উপকৃত হবে সেটা চিন্তা করতে হয়। আর আমরা সেভাবেই পদক্ষেপ নিই। আমাদের দেশকে কিভাবে উন্নত করা যায়, আমরা সেভাবে কাজ করছি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের একটু সমস্যা আছে, আমাদের যারা লেখাপড়া শিখে- লেখাপড়া শিখলেই তারা আর মাঠে যেতে চায় না। কৃষকের ছেলে, বাবা কৃষিকাজ করে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। অবশ্যই সবার মাঠে যাওয়া উচিত। যাবে না কেন? কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের- দুই পাতা পড়েই মনে করে আমি কেন যাবো! আমার মনে হয়, ওই চিন্তা থেকে দূরে থাকা দরকার। সে কারণে এবার ধান কাটার সময় আমাদের ছাত্রলীগকে বলেছিলাম, তোমরা ধান কাটতে চলে যাও। কৃষকদের পাশে দাঁড়াও। এতে লজ্জার কিছু নেই। নিজের কাজ নিজে করা লজ্জার কিছু থাকে না। নিজে খাদ্য উৎপাদন করবো নিজের খাবার নিজে খাবো এখানে লজ্জার কী আছে? তিনি বলেন, কোনো কাজে লজ্জার কিছু নেই, সব কাজ করার মতো ক্ষমতা থাকতে হবে। আমি বলেছি, প্রয়োজনে আমিও যাবো। আমি আমার গ্রামে বলে রেখেছি, তোমরা যখন ধান কাটবে বা বীজ রোপণ করবে তখন আমায় বলবে, আমি যাবো। আমার এতে কোনো লজ্জা নেই। শিক্ষিতদের কৃষিকাজে অনীহা দূর করা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জায়গাটায় আমাদের কৃষক লীগের একটা ভূমিকা থাকা দরকার। আমি মনে করি, আমাদের স্কুলজীবন থেকে এটা আমাদের অভ্যাস থাকা দরকার। ছোট বাগান করা, জমি চাষ করা বা যেখানে ফসল উৎপাদন হয় নিজের ফসল ঘরে তোলা। এটা একটা গর্বের বিষয়। তাই এটাকে এভাবে দেখতে হবে, কৃষিকে মর্যাদা দিতে হবে। মর্যাদা না দিলে নিজের পেটের ভাত আসবে কোথা থেকে? বিএনপি আমলে সারের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে ১৮ জন কৃষক পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সরকার গঠনের পর প্রথম কেবিনেটে সারের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিই। সারে ভর্তুকি দিয়ে কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। এখন সারের জন্য আর লাইনে দাঁড়াতে হয় না। ১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শেখ হাসিনা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, কোনো পরিবারে একজন মানুষ মারা গেলে তারা সে শোক সইতে পারে না। আর আমি কত শোক নিয়ে এখনও বেঁচে আছি। শুধু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্যই কাজ করে যাচ্ছি। তার আত্মা যেন শান্তি পায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল এ দেশের কৃষি, কৃষকের ভাগ্যের উন্নয়ন। যারা ফসল ফলায় তারা যেন ভালো থাকে। কারণ তিনি দেখেছেন, যে কৃষক দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান দেয় তাদের পরনে কাপড় থাকে না। তারা তিন বেলা ভাত খেতে পারে না। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষকের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি আমরা উন্নত হবো, শিল্পায়ন করব। তবে কৃষকদের বা কৃষিকে বাদ দিয়ে নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষকরাই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখে। কৃষক ফসল ফলায়, আমরা খেয়ে বেঁচে থাকি। একটি সমাজ ও দেশের জন্য কৃষক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কৃষকের সুবিধা দেয়া আমাদের কর্তব্য। ১৯৭২ সালে ১৯ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু কৃষক লীগ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তারা যেন কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কথা বলতে পারে। সরকার কৃষকের অধিকার সংরক্ষণে কাজ করছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আগে কৃষক ফসল ফলাত, কিন্তু তার পেটে খাবার ছিল না। তাদের পরনের কাপড় ছিল না। কৃষক যেন তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারে, সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ই-কৃষি চালু হয়েছে। কৃষকরা যেকোনো সমস্যার সমাধানে ‘১৬১২৩’ নম্বরে কল করে জানতে পারে। আমাদের কৃষকরাও এখন যথেষ্ট পরিপক্ব। মোট কথা, কৃষকদের যত ধরনের সুবিধা দেয়ার কথা, আমরা তা দিচ্ছি। কৃষিখাতে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গবেষণা ছাড়া কৃষি উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমরা গবেষণার মাধ্যমে উন্নতমানের বীজ উৎপাদন করছি। বর্তমানে দেশেই গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সবজি ১২ মাসই উৎপাদন করা যাচ্ছে। আমরা কৃষি উন্নয়নে গুরুত্ব দিচ্ছি। তিনি বলেন, আমরা এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। খাদ্য উৎপাদনে সারাবিশ্বে আমরা চতুর্থ অবস্থানে আছি। বাংলাদেশে একটি মানুষও আর গৃহহারা থাকবে না। তাদের প্রত্যেকের যেন মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়, আমরা সে ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষিকাজে যারা ভালো ফলাফল দেবে তাদের গবেষণা, উৎপাদন বিতরণ-সব ক্ষেত্রে যারা নাম ধনে রাখতে পারবে তাদের পুরস্কৃত করার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছিলেন। ৭৫-এর পর কৃষক এবং কৃষি গবেষকরা যে পুরস্কার পাবে সে পথও বন্ধ করে দিয়েছে। বিএনপি আমলে গবেষণা ক্ষেত্রে কোনো অর্থই বরাদ্ধ দেয়া হতো না। আমরা যখন আবার সরকার গঠন করি তখন পুনরায় এটা চালু করি। একই সঙ্গে, আমরা ‘বঙ্গবন্ধু কৃষি পুরস্কার ট্রাস্ট আইন, ২০১৬’ প্রণয়ন করি। আমরা সবসময় কৃষিকে গুরুত্ব দিয়েছিলাম বলেই দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। তিনি বলেন, আমরা আবার ক্ষমতায় এসে দেখলাম, গবেষণা খাতে একটি টাকাও বরাদ্দ নেই। বীজ বিতরনের ব্যবস্থাও বেসরকারি খাতে দেয়া হয়েছিল। ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে শুধু গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়নি, বেঁচে থাকার সব অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছিল। সম্মেলন শেষে এলাকায় গিয়ে কৃষকদের নতুন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সম্মেলনের প্রথম অধিবেশন সভাপতিত্ব করেন কৃষক লীগের সভাপতি আলহাজ মোতাহার হোসেন মোল্লা। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়। এরপর মঞ্চে উপবিষ্ট অতিথিদের ব্যাজ পরিয়ে দেয়া হয়। কৃষক লীগের প্রকাশনা মোড়ক উম্মেচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর উদ্বোধনী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরিবেশিত হয় ‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই’, ‘কৃষক বাঁচাও আর দেশ বাঁচাও শেখ হাসিনার নির্দেশ’ গান। শোক প্রস্তাব পাঠ করেন নাজমুল ইসলাম মানু। মুক্তিযুদ্ধসহ সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা করা হয়। অনুষ্ঠানে সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খন্দকার শামসুল হক রেজা। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও সর্বভারতীয় কৃষাণ সভার সাধারণ সম্পাদক অতুল কুমার অঞ্জন।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 bnewsbd24.Com
Design & Developed BY Md Taher