বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০৬:৪৬ পূর্বাহ্ন

উৎপাদন শুরুর আগেই বন্ধ হয়ে গেল কাঁকড়া পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারি

উৎপাদন শুরুর আগেই বন্ধ হয়ে গেল কাঁকড়া পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারি

বি নিউজ : উদ্বোধনের দু’সপ্তাহের মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেল দেশের একমাত্র সরকারি কাঁকড়া হ্যাচারি। চলতি বছরের ১৪ জুন হ্যাচারিটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু ৩০ জুন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় উদ্বোধনের ১৫ দিনের মাথায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কাঁকড়া হ্যাচারিটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। অথচ বিদেশে রফতানির পরিপ্রেক্ষিতে সমুদ্র উপকূলীয় জেলাগুলোয় কাঁকড়া চাষ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কাঁকড়া পোনার চাহিদা মেটাতে অবশ্যই কৃত্রিম উপায়ে রেণু উৎপাদনে সাফল্য পাওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। মৎস্য অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রাকৃতিক উৎস থেকে কাঁকড়ার পোনা সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমাতে কক্সবাজারে দেশের একমাত্র সরকারি কাঁকড়া পোনা হ্যাচারি স্থাপন করা হয়েছিল। গত বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের শহরতলির কলাতলী সাগর তীরে অবস্থিত মৎস্য অধিদপ্তরের পিসিআর ল্যাবসংলগ্ন স্থানে হ্যাচারির নির্মাণকাজ উদ্বোধন করা হয়। আর চলতি বছরের ১৪ জুন হ্যাচারিটি উদ্বোধন করা হয়। কিন্তু হ্যাচারিটি উদ্বোধনের আগেই গত মে মাসে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক (পরামর্শক) ফিলিপাইনের নাগরিক মিজ এমিলি নিজ দেশে ফিরে যান। এরপর তিনি আর এদেশে আসেননি। জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হলেও আর বাড়ানো হয়নি। ইতিমধ্যে ওই হ্যাচারিতে চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োজিত বিদেশী পরামর্শকসহ অন্যদের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। ফলে উৎপাদন শুরুর আগেই দেশে একমাত্র সরকারি কাঁকড়া পোনা উৎপাদনকারী হ্যাচারিটি বন্ধ হয়ে গেল। অথচ ৩ কোটি টাকার বেশি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত ওই হ্যাচারিতে প্রতি সাইকেলে বা ২৮ দিন অন্তর ৯০ হাজার করে পোনা উৎপাদন করার কথা ছিল।
সূত্র জানায়, দেশে নরম খোলসের কাঁকড়া চাষকে ভাইরাসসহ নানা রোগব্যাধির কারণে বিপর্যস্ত চিংড়ি শিল্পের বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছিল। বিশ্বের অন্তত ২০টি দেশে কক্সবাজারসহ দেশের উপকূলীয় জলাভূমি বা ঘেরে উৎপাদিত নরম খোলসের কাঁকড়া রফতানি হচ্ছে। ইতিমধ্যে ভিয়েতনাম, জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশে উৎপাদিত কাঁকড়ার সুখ্যাতি। ফলে চিংড়িচাষীরা ঝুঁকিমুক্ত এ চাষের দিকে ঝুঁকছে। বিদেশে কাঁকড়ার চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে এখন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাঁকড়ার চাষ করা হচ্ছে। কিন্তু কাঁকড়ার পোনার জন্য খামারিরা এখনো সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। সুন্দরবনের রেণু কাঁকড়ার ওপর নির্ভর করেই শুধু দক্ষিণের উপকূলীয় তিন জেলায় গড়ে উঠেছে প্রায় ১৯ হাজার কাঁকড়ার খামার ও ঘের। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘের ও খামার রয়েছে খুলনায়, সংখ্যায় তা প্রায় ১৫ হাজার। তাছাড়া সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটেও বিপুলসংখ্য কাঁকড়া ঘের ও খামার রয়েছে। সাতক্ষীরায় ঘেরের সংখ্যা কম হলেও বাণিজ্যিকভাবে বেশি কাঁকড়া উৎপাদন করা হচ্ছে।ওই জেলায় প্রায় ২৪ লাখ কেসে (খামারে ব্যবহার করা বিশেষ বক্স) কাঁকড়া উৎপাদন হয়। ওসব খামারের জন্য সুন্দরবন থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ রেণু কাঁকড়া ধরা হচ্ছে। এভাবে অবাধে কাঁকড়া পোনা ধরার ফলে সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট মানেই কাঁকড়া ও চিংড়ির উপস্থিতি থাকতেই হবে। সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি ও প্রতিবেশ রক্ষায় কাঁকড়ার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। কাঁকড়া পানির মান নষ্টের জন্য দায়ি এমন বেশ কয়েকটি প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। আবার কাঁকড়া খেয়ে বেঁচে থাকে অন্য কিছু প্রাণীও। যেমন ভোঁদড়ের প্রধান খাদ্য কাঁকড়া। খাদ্যের জোগান কমে যাওয়া এবং অন্যান্য প্রতিকূল কিছু কারণে ইতিমধ্যে সুন্দরবনে কমতে শুরু করেছে ভোঁদড়। অবাধে রেণু কাঁকড়া ধরার কারণে ভোঁদড়ের মতো কাঁকড়ার ওপর নির্ভরশীল আরো বেশকিছু প্রাণীও হুমকির মুখে পড়ছে।
অন্যদিকে কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এএসএম খালেকুজ্জামান একমাত্র সরকারি কাঁকড়া খামার বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দেশে কাঁকড়া ও কুঁচিয়া চাষ সম্প্রসারণের জন্য ৫ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্পের অধীনে চলতি বছরের জুনে কাঁকড়া পোনা হ্যাচারিটি উদ্বোধন করা হয়। তবে যে সময় হ্যাচারিটি উদ্বোধন করা হয় তখন প্রকল্পের মেয়াদ প্রায় শেষ। তাছাড়া ওই সময়টি পোনা উৎপাদনের মৌসুমও ছিল না। কাঁকড়ার পোনা উৎপাদন করা যায় ৫ মাস, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। এখন মৎস্য অধিদপ্তর যদি হ্যাচারিটি চালুর জন্য রাজস্ব খাত থেকে বরাদ্দ দেয়, তাহলে সেটি ফের চালু করা যাবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 bnewsbd24.Com
Design & Developed BY Md Taher