বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:৫৫ পূর্বাহ্ন

হ্যাকিং, ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নীতি ও বাংলাদেশ- শিব্বীর আহমেদ

হ্যাকিং, ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা নীতি ও বাংলাদেশ- শিব্বীর আহমেদ

ফেসবুকে মহানবী (সা.)-কে কটূক্তি করা নিয়ে ভোলায় জনতার বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন নিহত ও ১০ পুলিশসহ প্রায় দেড় শতাধিক আহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৯ জন। গত শুক্রবার বোরহানউদ্দিন উপজেলার বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক যুবকের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে এবং সেই আইডি থেকে আল্লাহ ও নাবী করিম (সা.) কে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ গালাগাল করা হয়। একপর্যায় কয়েকটি আইডি থেকে ম্যাসেজগুলোর স্ক্রিন শর্ট নিয়ে ফেসবুকে কয়েকজন প্রতিবাদ জানালে বিষয়টি সকলের নজরে আসে। এমনকি বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। প্রতিবাদে রোববার ভোলায় সভা সমাবেশ আহ্বান করা হয়।
এ অবস্থায় একইদিন সন্ধ্যায় বিপ্লব চন্দ্র বোরহানউদ্দিন থানায় আইডি হ্যাক হয়েছে মর্মে জিডি করতে আসলে থানা পুলিশ বিষয়টি তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিপ্লব চন্দ্রকে তাদের হেফাজতে রাখেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ এক হ্যাকারকে আটক করে। ভোলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়ছারের তাৎক্ষনিক ব্যবস্থায় হ্যাকের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে আটক করা হয়। এরপর শনিবার রাতে স্থানীয় আলেমদের সঙ্গে তিনি এই বিষয়ে কথাও বলেন। আলেম সম্প্রদায় তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন রবিবারের সমাবেশ হবে না। কিন্তু সকাল থেকেই সমাবেশ স্থলে মাইকিং এবং স্টেজ বানানোর তৎপরতা চলতে থাকলে সাথে সাথে মোহাম্মদ কায়ছার সেখানে গিয়ে উপস্থিত মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বক্তব্য দেন এবং তার বক্তব্য সবাই শুনেছে। কিন্তু থামেনি উত্তেজিত জনতা। শুরু হয় পুলিশ জনতা সংঘর্ষ। এই ঘটনা বাংলাদেশে নুতন নয়। এর আগেও বহুবার ফেইসবুক আইডি হ্যাক করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত হেনে সংঘর্ষে জড়িয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে।
বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছি আমার কিছু ফেইসবুক বন্ধু তাদের ব্যক্তিগত তথ্য তাদের টাইমলাইনে অবলীলায় তুলে দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে নুন্যতম সচেতনতা নেই যে তার এই তথ্যগুলো একান্তুই তার এবং এই তথ্যগুলো মধ্য দিয়েই তাকে সনাক্ত করা সম্ভব। এই তথ্যগুলো মাধ্যমে তার স্যোসাল একাউন্ট, ব্যংকিং অ্যাকাউন্ট সহ যাবতীয় গোপন সবই হ্যাক করা সম্ভব। কোন টেলিভিশন মিডিয়া বা পত্রপত্রিকাও এই ব্যপারে সরকারের সচেতনামুলক কোন বিজ্ঞাপন নেই। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের নেই কোন উদ্যেগ। এই তথ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের কোন আইন এবং শাস্তির বিধান আছে কিনা সেই বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছেনা।
বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের বিস্তারের ফলে অত্যাধুনিক কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সৃষ্টি হওয়ার মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য নিমেষেই আদান-প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে। উন্নত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ফলে সমাজে গণসম্প্রচারের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিগত তথ্যের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত ও সুরক্ষা অতীব জরুরি।
ব্যক্তিগত তথ্য দু’রকমের হয়ে থাকে। এক ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য যা একজন ব্যক্তিকে সরাসরি সনাক্ত বা চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। যেমন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোন ব্যক্তির নাম, ন্যাশনাল আইডি নাম্বার, মা ও বাবার নাম, জন্ম তারিখ, বা যেকোন বায়োমেট্রীক রেকর্ড যেমন আঙ্গুলের ছাপ ইত্যাদি। উপর্যুক্ত এই তথ্যগুলো একজন ব্যক্তিকে সরাসরি চিহ্নিত বা সানাক্ত করতে সক্ষম। আরেক ধরনের তথ্য আছে যেগুলো লিংকেবল বা লিংকযোগ্য তথ্য। একটি তথ্যের সাথে আরেকটি তথ্য সংযুক্ত করে কাউকে সনাক্ত করতে সক্ষম। এই তথ্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ড্রাইভিং লাইসেন্স, মেডিকেল তথ্য, ফাইনানসিয়াল তথ্য, ক্রেডিট কার্ড, চাকুরির তথ্য, শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য ইতাদি। এই তথ্যগুলো একটির সাথে আরেকটি সংযুক্ত করেও একজন মানুষকে সনাক্ত বা চিহ্নিত করা সম্ভব। একজন ব্যক্তির জন্য এই তথ্যগুলো খুবই গোপনীয় এবং একান্তই ব্যক্তিগত। এই তথ্যগুলো জনসম্মুখে প্রচার বা প্রচার করা খুবই ঝুঁকিপুর্ণ। এই তথ্যগুলোর জন্য ইন্টারনেটে হ্যাকাররা বসে থাকে এবং সুযোগ পেলেই তারা এই তথ্যগুলোর মাধ্যমে ব্যক্তির যেকোন কিছু হ্যাক করতে পারে।
উন্নত বিশ্বে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কঠোর আইন এবং আইনের প্রয়োগ রয়েছে। আছে যথাযথ ট্রেনিং এর ব্যবস্থা। বিশেষ করে সরকারি কর্মকা-ে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে বিশেষ উদ্যেগ। ব্যক্তিগত তথ্য কে ব্যবহার করতে পারবে, কিভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং সঠিক ভাবে ব্যবহার না করলে তার শাস্তি কি হবে ইত্যাদি নীতিমালা কঠোরভাবে পালন করা হয় এবং নিয়মিত মনিটর করা হয়।
জনগনের প্রদান করা অর্থে পরিচালিত গণসম্প্রচার সংস্থা হিসাবে জাপান ব্রডকাস্টিং করপরেশন বা এনএইচকে দর্শক-শ্রোতাদের ব্যক্তিগত তথ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে থাকে এবং প্রতিষ্ঠানটি এ বিষয়ে অবগত রয়েছে যে, ব্যক্তির মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শন নীতির আওতায় ব্যক্তিগত তথ্য সতর্কতার সঙ্গে এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করা উচিত। দর্শক-শ্রোতাদের ব্যক্তিগত তথ্যের যথাযথ ব্যবহার এনএইচকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এনএইচকে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন (২০০৩ সালের ৫৭ নম্বর আইন) এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংক্রান্ত অন্যান্য আইন ও বিধি মেনে চলতে এবং এনএইচকের নিজস্ব বিধি অনুযায়ী ব্যক্তিগত তথ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্যে এনএইচকে, এর পরিষেবা প্রদানের অংশ হিসেবে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। জাপান ব্রডকাস্টিং করপরেশন বা এনএইচকের এই দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের সকল মিডিয়ায় ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত বলে মনে করছি।
বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশের ৪৩ (খ) অনুচ্ছেদে ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে’ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার সংরক্ষণের কথা বলা আছে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্যে সুনির্দিষ্ট আইন নেই। তবে আইনের চেয়েও জরুরি এ বিষয়ে জনসচেতনতা। কিন্তু সেটিও নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কেউ বুঝতেই পারছে না কখন কোথায় কেমন করে ব্যক্তিগত তথ্য চলে যাচ্ছে অন্যের হাতে বা হ্যাকারের হাতে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে। তবে আইনের পাশাপাশি নৈতিকতার উন্নয়ন ও আইনের প্রয়োগ জরুরি।
পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এই বিষয়ে আইন আছে ও আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত কড়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ইউরোপে, জাপানে ও কোরিয়ায় এরকম আইনের যথাযথ প্রয়োগের ফলে অনেক বড় রকমের ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচনা ও সচেতনতার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশেও এই সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। দিন যত যাচ্ছে জঙ্গীবাদ সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বিশ্বে। ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে হত্যায় লীপ্ত হচ্ছে এক ধরনের সন্ত্রাসবাদ। এ থেকে রক্ষার উপায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি নৈতিকতার উন্নয়ন ব্যক্তিগত তথ্যের ক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত মনিটরিং। দেশে বিদেশে নানা রকম তথ্য-প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে। একদিকে এই প্রযুক্তির সীমাহীন সম্ভাবনা, অপরদিকে এর ক্ষতিকর দিকগুলো আমাদের বিব্রত করছে। আমাদের দেশের ইন্টারনেট নিরাপত্তা নিয়ে উন্নত দেশগুলো সন্তুষ্ট নয়। ফলে এদিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। সরকার যত দ্রুত এই বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিতে পারবে তত দ্রতই হয়ত ভোলার মত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে।
শিব্বীর আহমেদ সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ, যুক্তরাষ্ট্র

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 bnewsbd24.Com
Design & Developed BY Md Taher