বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ০১:৪৩ পূর্বাহ্ন

ছোট ছোট স্বপ্নগুলো পুড়ে ছাই । মোহাম্মদ আবু নোমান

ছোট ছোট স্বপ্নগুলো পুড়ে ছাই । মোহাম্মদ আবু নোমান

আগুনের সাথে যুদ্ধ করে; শুধু যুদ্ধই নয়; আগুনকে পরাজিত করেই ওদের প্রতিদিন চলতে হয়! আজ হয়তো আগুনে পুড়েছে দেখে, বা কেউ শুনে সাময়িক একটু কষ্ট অনুভাব করছেন। কিন্তু বছরব্যাপীই ওদের জীবনযুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর-৭ নম্বর সেকশনের ঝিলপাড়ের চলন্তিকা বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকা- ঘটে। এ ঘটনায় প্রায় ৮ সহস্রাধিক পরিবারের স্বপ্ন পুড়ে যায়। পোড়া ধ্বংসস্তূপ হাতড়ে বেড়াচ্ছেন সবহারানো মানুষ। সেখানে খুঁজে ফিরছেন কিছু অবশিষ্ট আছে কি না। কিন্তু পাচ্ছেন না কিছুই। ভয়াবহ আগুনে সেখানে বেঁচে যাওয়ার মতো কিছুই নেই। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সম্পদ বস্তিবাসীর ছিল। সেই সম্পদ হয়তো অনেক বেশিও নয়। কিন্তু বস্তিবাসীর কাছে যে তা অনেক। বেশির ভাগ বাসিন্দাই একমাত্র প্রাণটা হাতে নিয়ে এক কাপড়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। হাঁড়ি-পাতিল, কাঁথা-কাপড়, গয়না-গাঁটি, বই-খাতা সবকিছু পুড়ে ছাই। পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে তাদের অনেক দিনের জমানো ছোট ছোট স্বপ্ন ও সম্পদ।
পোড়া ছাই-ভস্মের মাঝে ওরা আর কি খুজবে! ওদের জীবনটাই তো পোড়া! কি সুখ আছে ওদের জীবনে! কি স্বপ্নই বা থাকতে পারে ওদের! বাঁশ, কাঠ আর টিন দিয়ে তৈরি ছিল খুপরি ঘরগুলো। শুধু তা-ই নয়, অপরিকল্পিতভাবে শতশত দোতলাও ঘর করা হয়েছিল। এই ঘিঞ্জি বস্তিতে এখন শুধু কয়লা আর ছাইয়ের স্তূপ, যা লেলিহান আগুনের সর্বগ্রাহী লেহনের চিহ্ন হয়ে আছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাজারো সদস্যের এখন মাথাগোঁজার ঠাঁই নেই। খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চিত এক পরিস্থিতিতে পড়েছে তারা। পুরুষেরা টয়লেটের জন্য নিজেদের মতো ব্যবস্থা করে নিলেও মেয়েরা সমস্যায় পড়েছেন।
ঢাকা শহরের বেশীরভাগ বস্তির বাসিন্দাই, গৃহকর্মী, দাড়োয়ান, দিনমজুর, কলকারখানা বা গার্মেন্টস শ্রমিক। শুধু রাজধানীতে কমবেশি ৩০ লাখ লোক বিভিন্ন বস্তিতে বাস করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পোশাকশ্রমিক। ঝিলপাড়ে যাদের ঘর পুড়েছে, তাদের মধ্যে নিশ্চিতভাবেই অনেক পোশাককর্মী রয়েছেন। নাগরিক সমাজের বিজ্ঞজনরা বলে থাকেন, গার্মেন্টস শ্রমিকরাই নাকি বাংলাদেশের প্রাণশক্তি। একটি দেশের এই প্রাণশক্তির জীবন-মান দেখতে চাইলে, বস্তিতে গেলেই হবে। পোশাকশিল্প, শ্রমিক বা বিচিত্র যে পেশাতেই বস্তিবাসীরা জড়িত থাকুক, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে তারাই মূল ভূমিকা রেখে চলেছেন। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বস্তিবাসীর ভূমিকা অনশিকার্য। অথচ তারা নানা সময় উচ্ছেদ এবং চাপের মুখে থাকেন।
কাজ না পেয়ে, ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে, বন্যা কিংবা মঙ্গা এলাকার গ্রামীণ মানুষেরাই শহরে এসে বস্তিতে উঠে। আকাশই যাদের ছাঁদ বা শামিয়ানা, কোথাও থাকার বা যাওয়ার জায়গা নেই বলে তাদের হার মানারও উপায় নেই। এজন্য প্রতিবার পুড়ে যাওয়ার পরও ‘পালাবি কোথায়’ যেনো তাদের নিয়তি। এখন নতুন করে ঘর তোলার জন্য তাদের দাঁড়াতে হবে, ধরনা ধরতে হবে, নগর প্রশাসন, গডফাদার ও ক্ষমতাসীন জমিদার চাঁদাবাজদের কবলে। এভাবে তাদের আবার মাথা তুলে দাঁড়াবার ও ঘর বাঁধার খুঁটি পুঁততে হবে।
আগুন কেন লেগেছে, কীভাবে লেগেছে, তা নিয়ে প্রতিবারই চলে নানা বিতর্ক। কারও মতে, এসব বস্তির দখলদার থাকে অনেক। কারও দখলে দশ ঘর, আবার কারও দখলে ৫০ ঘর, ১০০ ঘর। তাই অপেক্ষাকৃত শক্তিধর দখলদারেরা নিজেদের দখলি এলাকাকে আরও সম্প্রসারিত করতে বস্তিতে আগুন দিয়ে নতুন কোন ফন্দি বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা করছে। ঢাকায় কোনো কোনো বস্তিতে বছরে গড়ে অন্তত দুবার আগুন লাগে। প্রতিটি বস্তিতে ঘুরে-ফিরে বছরে একবার আগুন লাগাতো স্বভাবিক। এভাবে আগুন লাগার কিংবা লাগাবার রহস্যভেদ করার কোনো কর্তৃপক্ষ খুঁজে পাওয়া যাবে কী? বস্তি পোড়ার দায় কেউ নেয় না। নগর প্রশাসন, দমকল বিভাগ ও সরকার দায়সারা একটি ‘বয়ান’ দিবে মাত্র।
বস্তিবাসীরা কেউই বিনা ভাড়ায় থাকতে পারেন না। বিনা পুঁজিতে বস্তা ভর্তি টাকা আদায়ের আখড়া একেকটা বস্তি। সাথে মাদকের ব্যবসাতো আছেই। ক্ষমতাসীনরা সরকারি জায়গায় বস্তি বসিয়ে ভাড়া তুলে থাকে। বস্তির লোককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতাপও দেখান। অবৈধ পথে পেতে হয় বলে, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি তাদের কিনতে হয় বাজার মূল্যের চাইতে বেশি দরে। সবমিলিয়ে মধ্যবিত্তরা যে ভাড়া দিয়ে ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকেন, বর্গফুট হিসেবে তাদের চেয়ে বস্তির ভাড়া কম নয় মোটেই।
ঢাকার বনানীর কড়াইল বস্তিতে গত এক দশকে ১৭ বার অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে গত তিন বছরে ছয়বার লাগা অগ্নিকা-ের তিনটিকেই ‘নাশকতা’ বলে দাবি করেন ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসী। বস্তিতে বারবার অগ্নিকা-ের কারণ কী? বস্তির অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, সরকারি জায়গা দখল নিতে দুর্বৃত্তরা বস্তিতে আগুন লাগায়। বস্তিতে নতুন দখলদারের ছড়ি ঘোরানো, ভূমি দখলের রাজনীতি এবং অর্থনীতিসহ অনেক মহাকূটপরিকল্পনা থাকে ঝুপড়ি ঘরগুলো ঘিরে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তখন সেই সরকারের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মীর প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসীরা অগ্নিকা- সংঘটন করে। প্রতিটি ঘটনার পরই গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। কিন্তু তদন্তের পরও বস্তিবাসীর ‘নাশকতার’ অভিযোগের সত্যতা পায় না সংশ্লিষ্টরা। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছেÑ বস্তিতে কেন বারবার আগুন লাগে? বস্তির আগুন কি দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা? অথচ বস্তিদের মাদক ব্যবসাসহ বিবিধ অপরাধকর্মে তাদের যারা ব্যবহার করেন, তারা কিন্তু বস্তির লোক নন। তারা থাকেন ‘ভিআইপি’ এলাকায়। তাদের কাউকে কাউকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জনসেবক ও সাংসদ হিসেবেও জেনে থাকে সর্বসাধারণ।
রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে পুড়ে যাওয়া ঝিলপাড় বস্তিটিতে আগুন লাগার প্রাথমিক কারণ, সেখানে কোনো শৃঙ্খলা না থাকা। প্রচলিত ব্যবস্থার আওতায় বস্তিবাসীদের পক্ষে বৈধভাবে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার দরজা বন্ধ ছিল। ঝিলপাড়ের বস্তি ‘অবৈধ’, তাই সরকার কখনো ভাবেনি তাদের নিরাপত্তা ও বৈধভাবে ইউটিলিটি সার্ভিস দেওয়ার ব্যাপারে। সরকারি জমির ওপরে গড়ে ওঠা বস্তি থেকে যারা প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের মাসোহারা নিয়েছেন, তারা আগুন লাগার কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায় এড়াতে পারেন কী?
যে ৫০ জন ‘নব্য আওয়ামী লীগার’ (রূপনগর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী) এই বস্তি থেকে অবৈধভাবে মাসে ৩০ লাখ টাকার বেশি তুলতেন, তাদের দায়দায়িত্ব চিহ্নিত করা জরুরি। কোন নব্য আওয়ামী লীগার দ্বারা চাঁদা তোলা সম্ভব কিনা তা বুঝতে হলে প্রাইমারির বেশি জ্ঞানার্জন লাগে না। যাই হোক, কথিত চাঁদাবাজদের মধ্যে যারা ‘নব্য আওয়ামী লীগার’, তাদের বহিষ্কার করা সংগঠনটিরই দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
অগ্নিকা-ের ব্যাপারে বস্তিবাসীদের কেউ কেউ বলছেন, সুপরিকল্পিতভাবে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে আগুন। তাদের অভিযোগ, বস্তিতে অগ্নিকা-র ঘটনা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র। তাদের দাবি, বস্তি উচ্ছেদের জন্য কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ঝিলপাড় বস্তির আগুন নেভানো থেকে শুরু করে উদ্ধারকার্যে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ‘বস্তিতে লাগা আগুন ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠার পেছনে ছিল অবৈধ গ্যাসের লাইন। এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণেই আগুন তীব্র হয়েছে। তিনি বলেন, বস্তিতে প্রচুর অবৈধ গ্যাসের সংযোগ ছিল। এ লাইনগুলো টানা হয়েছিল প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে। যে কারণে আগুন ভয়ঙ্কর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া বস্তির অধিকাংশ ঘরই বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে তৈরি। প্রায় প্রতিটি ঘরই ছিল দ্বিতল। এগুলো খুবই দাহ্য পদার্থ। আগুনের সংস্পর্শে এসে দ্রুত জ্বলে বিস্তার ঘটেছে।’
জানা যায়, পুড়ে যাওয়া ঝিলপাড় বস্তি থেকে মাসে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল ওঠে প্রায় দেড় কোটি টাকা। এই তিনটি সেবা খাতের মধ্যে গ্যাস থেকে সরকার কোনো টাকাই পায় না। আর বিদ্যুৎ ও পানি থেকে খুব সামান্য অর্থ জমা হয় সরকারি কোষাগারে। পানি বাবদ ১৫ লাখ টাকা তোলে সরকারি দলের সিন্ডিকেট। বিদ্যুৎ বিল ৫৫ লাখ, সেখান থেকে ডেসকো পায় মাত্র ৫ লাখ টাকা। অথচ বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য প্রতিটি ঘরের বাসিন্দাকে দিতে হয় ৩০০ থেকে ১ হাজার টাকা। এ তো শুধু এক বস্তির পরিসংখ্যান মাত্র। সারা দেশে এ রকম হাজারো বস্তি রয়েছে। দেশের প্রতিটি বস্তিতেই গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির চুরির উৎসব চলছে। এভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ পানির খাতে লস ও লোকসান দেখিয়ে, গণশুনানির ফল তোয়াক্কা না করেই দাম বৃদ্ধির বোঝা বহন করতে হয় সাধারণ জনগণকে। এগুলো দেখার যেন কেউ নেই।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তথ্যানুযায়ী, গত বছর (২০১৮ সালের জানুয়ারি-ডিসেম্বর) সারাদেশে ১৬৫টি বস্তিতে আগুন লাগে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩৩, চট্টগ্রামে ৪৩, রংপুরে ৮৮ এবং সিলেট বিভাগে ১টি বস্তি আগুনে পুড়ে যায়। এসব অগ্নিকা-ে আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯৩ কোটি ৬১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৫০ টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত ১৬ আগষ্ট পর্যন্ত সারাদেশে ২৮টি বস্তি পুড়েছে। এসব ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে নারী-শিশু-বৃদ্ধসহ ১৮ জনের।
বস্তিবাসীদের পর্যায়ক্রমে কী করে আবাসনসংকট নিরসন করা যায়, সেটা নীতিনির্ধারকদের কখনো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে দেখা যায়নি। বস্তির মানুষ পৃথিবীর বাইরের অন্য কোন গ্রহের নয়। বস্তির নাগরিকদের জীবনের প্রতি সরকারে কোন দায় আছে কী? সর্বশেষ কথা হলো, একটি মানবিক অর্ন্তবর্তীকালীন ব্যবস্থার মাধ্যমে আগুনে সব হারানো মানুষগুলোর জন্য স্থায়ী মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 bnewsbd24.Com
Design & Developed BY Md Taher