সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২০, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন

চলে গেলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

চলে গেলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

বি নিউজ : সুরের মায়া কাটিয়ে চিরবিদায় নিলেন বরেণ্য সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। দীর্ঘ চার দশকের ক্যারিয়ারে দুইশর বেশি চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করে গেছেন তিনি। ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’র মত দেশাত্মবোধক গানে তার দেওয়া সুর বাংলাদেশের মানুষের বুকে চিরদিন বাজবে। মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর আফতাবনগরের বাসায় হার্ট অ্যাটাক হলে বুলবুলকে মহাখালীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে গীতিকার কবীর বকুল জানান। একুশে পদক পাওয়া এই গানের মানুষটির বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি হৃদযন্ত্রের জটিলতায় ভুগছিলেন। হার্টে ব্লক ধরা পড়ায় গতবছর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে তার অস্ত্রোপচারও করা হয়েছিল। সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। হাসপাতালের চিকিৎসকরা শেষ কথা জানিয়ে দেওয়ার পর সকালে পরিবারের সদস্যরা বুলবুলের মরদেহ নিয়ে যান আফতাবনগরের বাসায়। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এই গীতিকার- সুরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, বুলবুলের মরদেহ মঙ্গলবার বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়। আজ বুধবার বেলা ১১টায় তার কফিন নিয়ে যাওয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবদনের আগে এই মুক্তিযোদ্ধার প্রতি জানানো হবে রাষ্ট্রীয় সম্মান। বুলবুলের ছেলে সমীর আহমেদ জানান, বুধবার জোহরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে তার বাবার জানাজা হবে। আসরের পর মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা বুলবুল ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি জন্ম নেওয়া আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেন মাত্র ১৫ বছর বয়সে। তখন তিনি ঢাকার আজিমপুরের ওয়েস্টটেন্ট হাইস্কুলের ছাত্র। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসালমীর সাবেক আমীর গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা বুলবুল। ২৫ মার্চ রাতের গণহত্যা দেখার পর প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত নেন বুলবুল ও তার কয়েকজন বন্ধু। প্রথমে বিহারিদের বাসা থেকে অস্ত্র ছিনতাই করে ছোট একটি মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করেন তারা। পরে জিঞ্জিরায় মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি তৈরি করেন। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে টিকতে না পেরে ঢাকায় ফিরে আসেন বুলবুল। জানতে পারেন বড় ভাই ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ টুলটুল মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা দল ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দিয়েছেন। পরে বড় ভাইয়ের কাছ থেকে পাওয়া গ্রেনেড নিয়ে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে নিউ মার্কেটের ১ নম্বর গেইটে পাকিস্তানি বাহিনীর লরিতে আক্রমণ করেন বুলবুল ও তার বন্ধূ সরোয়ার। অগাস্টে ভারতের মেলাঘরে গিয়ে এক দফা প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে ঢাকার লালবাগ এলাকায় কাজ শুরু করেন বুলবুল ও তার বন্ধু সজীব। তাদের প্লাটুনকে বলা হত ওয়াই (ইয়াং) প্লাটুন। অক্টোবরে রোজার মাসে আবার ভারতে যাওয়ার সময় কুমিল্লা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝামাঝি তন্তর চেকপোস্টে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে বন্দি হন বুলবুলরা চারজন। নির্মম নির্যাতনের পর তাদের উলঙ্গ অবস্থায় বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে। সেই জেলখানায় অন্তত ৫৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বন্দি রেখেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। রোজার ঈদের দিন সন্ধ্যায় ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় পুলিশ কর্মকর্তা ছিরু ও তার ছেলেসহ ৩৯ জনকে আলাদা করে জেল থেকে বের করে এনে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। তাদের মধ্যে একজন প্রাণে বেঁচে যান। দুই দিন পর বুলবুলদের চার বন্ধুকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শান্তি কমিটির অফিস দানা মিয়ার বাড়িতে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। সেই রাতেই সেখান থেকে পালিয়ে যান বুলবুলরা। ২০১২ সালের অগাস্টে বুলবুল ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পরের বছর খুন হন তার ছোট ভাই আহমেদ মিরাজ। ২০১৩ সালের ৯ মার্চ রাতে কুড়িল ফ্লাইওভারের পাশ থেকে পুলিশ মিরাজের লাশ উদ্ধার করে। সেই ঘটনার বিচার না পাওয়ায় হতাশা ছিল বুলবুলের মনে। ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ সিনেমায় সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন বুলবুল। এরপর আমৃত্যু তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন সংগীতের সাধনায়। বেলাল আহমেদের পরিচালনায় ১৯৮৪ সালে নয়নের আলো চলচ্চিত্রের সংগীতায়োজন করেন বুলবুল। ওই সিনেমার জন্য তার লেখা ‘আমার সারাদেহ খেয়োগো মাটি’, ‘আমার বাবার মুখে’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমি তোমার দুটি চোখের দুটি তারা হয়ে’ গানগুলো সে সময় তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এর পরের চল্লিশ বছরে মরনের পরে, আম্মাজান, প্রেমের তাজমহল, অন্ধ প্রেম, রাঙ্গা বউ, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, পরেনা চোখের পলক, তোমাকে চাই, লাভ স্টোরি, ভুলোনা আমায়, আজ গায়ে হলুদ, লাভ ইন থাইল্যান্ড, আন্দোলন, মন মানে না, জীবন ধারা, সাথি তুমি কার, হুলিয়া, অবুঝ দুটি মন, লক্ষ্মীর সংসার, মাতৃভূমি, মাটির ঠিকানাসহ দুইশ শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন বুলবুল। প্রেমের তাজমহল সিনেমার জন্য তিনি ২০০১ সালে এবং হাজার বছর ধরে সিনেমার জন্য ২০০৫ সালে শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। দেশের সংগীত অঙ্গনে অবদানের জন্য ২০১০ সালে সরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে একুশে পদকে ভূষিত করে। চলচ্চিত্রের জন্য সংগীত আয়োজনের পাশাপাশি দেশের সমকালীন শিল্পীদের নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করেছেন বুলবুল। তার কথা আর সুরের গান নিয়ে সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আবদুল হাদি, এন্ড্রু কিশোর, সামিনা চৌধুরী, খালিদ হাসান মিলু, আগুন, কনক চাঁপাসহ দেশের বহু জনপ্রিয় শিল্পীর অ্যালবাম বের হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির শোক: আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যু দেশের সাংস্কৃতিক জগতের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তার অসামান্য সৃষ্টিকর্মের জন্য চিরদিন মানুষ তাকে স্মরণ করবে। রাষ্ট্রপতি একুশে পদকপ্রাপ্ত এই গীতিকার-সুরকারের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর শোক: বুলবুলের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। এক শোক বার্তায় প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, একুশে পদক ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে দেশ একজন বরেণ্য সংগীত ব্যক্তিত্বকে হারালো। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে, বিশেষ করে চলচ্চিত্র সংগীতের অপূরণীয় ক্ষতি হল। বহু কালজয়ী গানের ¯্রষ্টা এ শিল্পী তিন শতাধিক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন। সংগীতাঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলাদেশের মানুষ তাকে দীর্ঘকাল স্মরণে রাখবে।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 bnewsbd24.Com
Design & Developed BY Md Taher