শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন

ইজতেমায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাবলিগের দু’পক্ষে সংঘর্ষ, নিহত ১

ইজতেমায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তাবলিগের দু’পক্ষে সংঘর্ষ, নিহত ১

বি নিউজ : গাজীপুরের টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আজ শনিবার সকালে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় আহত এক বৃদ্ধ মারা গেছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আজ শনিবার দুপুরে টঙ্গী থানার ওসি কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, সকালে আশকোনা এলাকায় তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েক আহত হয়। এর মধ্যে ইসমাইল হোসেন (৭০) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন। তাঁর বাড়ি মুন্সীগঞ্জে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। আজ শনিবার সকাল ৮টার দিকে বিমানবন্দর সংযোগ সড়কে তাবলিগ জামাতের মাওলানা সাদ ও তাঁর প্রতিপক্ষ মাওলানা জুবায়েরের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে বলে বার্তা সংস্থা ইউএনবিকে বলেন আবদুল্লাহপুর জোনের ট্রাফিক পরিদর্শক আসাদ। পুলিশ জানিয়েছে, এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এই কারণে উত্তরা থেকে মহাখালী পর্যন্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কিছু পরে পুলিশ এসে রাস্তার একদিক থেকে লোকজনকে সরিয়ে দেয়। এতে সড়কের একটি পথে যান চলাচল শুরু হয়। কেউ যান চলাচলে বাধা দিচ্ছে না। ইজতেমার একটি সূত্র জানায়, কয়েকদিন ধরেই মাওলানা সাদের প্রতিপক্ষ মাওলানা জুবায়েরের সমর্থকরা টঙ্গীর তুরাগ তীরের ইজতেমার ময়দানে অবস্থান নেন। আজ শনিবার সকালে মাওলানা সাদের সমর্থকরা ময়দানে প্রবেশ করতে গেলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষের বেশ কিছু ভিডিও চিত্র ও আলোকচিত্র সামাজিক যোগযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাজার হাজার মুসল্লি ময়দানের দেয়াল ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। ভেতর থেকে তাদের ইট ছুড়ে প্রতিহতের চেষ্টা করছেন প্রতিপক্ষ। একপর্যায়ে দেয়াল ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করলে দুইপক্ষের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ শুরু হয়। লাঠি নিয়ে একপক্ষ আরেক পক্ষকে আঘাত করে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, সংঘর্ষের সময় এক বৃদ্ধ পড়ে যান। তখন তাঁকে প্রতিপক্ষের অনেকে ঘিরে বাঁশ দিয়ে অনরবত আঘাত করতে থাকেন। তাঁর পাশেই পড়ে রয়েছেন আরেক বৃদ্ধ। তাঁর পায়েও বাঁশ দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। আহত অবস্থায় অনেককে উদ্ধার করে নেয়ার দৃশ্যও দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আলোকচিত্রে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার একপর্যায়ে সাদপন্থীরা মাঠের দখল নিয়ে নেয়। তখন ভেতরে থেকে মাওলানা জুবায়েরের সমর্থকরা সরে যায়। দুপুরের দিকে পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই এলাকায় গিয়ে ময়দান ছাড়ার জন্য মাইকিং করতে থাকে। এ সময় র‌্যাবের হেলিকপ্টারকে মাঠের উপর টহল দিতে দেখা যায়। দুপুরের পর সাদপন্থীরা মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে থাকে। তখনই এলাকার পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে। গত শুক্রবার নির্বাচন কমিশন থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগামি ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে ইজতেমা ময়দানে জড়ো হওয়া যাবে না। কোনো ওয়াজ, মাহফিল, ধর্মীয় সমাবেশও করা যাবে না। সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করেই গতকাল শনিবার দুই পক্ষ ইজতেমা ময়দানে জড়ো হয়। মাওলানা সাদের সমর্থকরা জানায়, গতকাল শনিবার থেকে ময়দানে তাদের পাঁচদিনের জোড় শুরু হওয়ার কথা। একে কেন্দ্র করেই তাঁরা সেখানে এসেছেন। হাজার হাজার মাওলানা সাদ সমর্থক ময়দানের প্রতিটি গেটের সামনে অবস্থান নেয়। মুসল্লিরা আশকোনা, কামারপাড়া, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেন। গত বছর বিশ্ব ইজতেমার সময় থেকেই দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসতে থাকে। এর জের ধরে গত এপ্রিলে তাবলিগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র রাজধানীর কাকরাইল মসজিদে একপক্ষ আরেকপক্ষকে আটকেও রাখে। তখন সরকার দুই পক্ষকে নিবৃত্ত করতে বৈঠকও করে। টঙ্গীতে বিশ্বের বড় ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের উপস্থিতিতে তাবলিগ জামায়াতের বিবদমান দুই পক্ষের সভা হয়। সেই সভা থেকে ডিসেম্বর মাসের বিশ্ব ইজতেমা স্থগিত ঘোষণা করা হয়। আগামি জানুয়ারিতে বিশ্ব ইজতেমা হওয়ার কথা ছিল। সেই সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি), ধর্ম সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। স্বেচ্ছামূলক এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধের প্রচার। বিতর্ক দূরে রাখতে এ সংগঠনে রাজনীতি ও ফিকাহ নিয়ে আলোচনা হয় না। মাওলানা ইলিয়াছের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাওলানা মোহাম্মদ ইউসুফ এবং তারপর মাওলানা ইনামুল হাসান তাবলিগ জামাতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। মাওলানা ইনামুলের মৃত্যুর পর একক আমিরের বদলে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার দেওয়া হয় একটি শুরা কমিটির ওপর। সেই কমিটির সদস্য মাওলানা জুবায়েরের মৃত্যুর পর মাওলানা সাদ আমিরের দায়িত্ব নেন এবং একক নেতৃত্বের নিয়ম ফিরিয়ে আনেন। এ অবস্থায় মাওলানা জুবায়েরের ছেলে মাওলানা জুহাইরুল হাসান নেতৃত্বের দাবি নিয়ে সামনে আসেন এবং তার সমর্থকরা নতুন করে শুরা কমিটি গঠনের দাবি জানান। কিন্তু সাদ তা প্রত্যাখ্যান করলে বিরোধ বড় আকার ধারণ করে। বিভিন্ন সময়ে মাওলানা সাদের বক্তব্য নিয়েও আলেমদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়। নেতৃত্ব নিয়ে দিল্লির মারকাজ এবং দেওবন্দ মাদ্রাসার অনুসারীদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব প্রকট আকার ধারণ করে চলতি বছর জানুয়ারিতে ঢাকায় বিশ্ব ইজতেমার সময়। কয়েক বছর ধরে বিশ্ব ইজতেমায় আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করে আসা সাদ কান্ধলভি এবার ঢাকায় এসে বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে পড়েন। শেষ পর্যন্ত সরকারে মধ্যস্থতায় ইজতেমায় অংশ না নিয়েই তাকে ঢাকা ছাড়তে হয়। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের প্রধান কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদে ওই বিরোধের জের চলে বছরজুড়ে। গত এপ্রিলে দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে হাতাহাতিও হয়। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে সাদের অনুসারীরা ৩০ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর টঙ্গীতে জোড় ইজতেমা এবং ১১ থেকে ১৩ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। অন্যদিকে দেওবন্দপন্থিরা ৭ থেকে ১১ ডিসেম্বর জোড় ইজতেমা এবং ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব অনুষ্ঠানের কথা জানায়। দুই পক্ষ আলাদাভাবে ইজতেমা করার ঘোষণা দিলে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। এই পরিস্থিতিতে গত ১৬ নভেম্বর সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সভাপতিত্বে এক বৈঠক থেকে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব স্থগিত করা হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, উভয় পক্ষের মধ্যে সমাঝোতার মাধ্যমে বিশ্ব ইজতেমার একটি তারিখ নির্ধারণে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভারতের দেওবন্দে যাবে। দুই পক্ষ সমঝোতায় এলে নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে। কিন্তু সাদপন্থিরা ৩০ নভেম্বর থেকে জোড় ইজতেমা করার প্রসন্তুতি নিলে অন্যপক্ষ তুরাগ তীরে ইজতেমা মাঠের সব কটি ফটকে পাহারা বসায়। এই পরিস্থিতিতে সাদপন্থীরা গত ২৭ নভেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে। অন্যদিকে জুবায়েরপন্থিরা গত ২৪ নভেম্বর ইসিতে চিঠি দিয়ে টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘ভয়াবহ অবনতির শঙ্কা’ প্রকাশ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আবেদন করে। এর ভিত্তিতে ইসির যুগ্মসচিব ফরহাদ আহাম্মদ খান গত শুক্রবার গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে চিঠি দিয়ে ৩০ ডিসেম্বর ভোটের আগে টঙ্গীতে তাবলিগ জামাতের যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান না করার নির্দেশনা দেন। উপমহাদেশে সুন্নী মতাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় সংঘ তাবলিগ জামাতের মূলকেন্দ্র ভারতের দিল্লিতে। মাওলানা সাদের দাদা ভারতের ইসলামি প-িত ইলিয়াছ কান্ধলভি ১৯২০ এর দশকে তাবলিগ জামাত নামের এই সংস্কারবাদী আন্দোলনের সূচনা করেন।

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 bnewsbd24.Com
Design & Developed BY Md Taher