শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০, ০৫:৩৮ পূর্বাহ্ন

দীর্ঘ ফ্লাইওভার নয়, ক্রসিং পয়েন্টে ওভারব্রিজই যানজটের সমাধান| জালাল উদ্দিন ওমর

দীর্ঘ ফ্লাইওভার নয়, ক্রসিং পয়েন্টে ওভারব্রিজই যানজটের সমাধান| জালাল উদ্দিন ওমর

যানজটে যখন নগরবাসীর জীবনে দুর্বিষহ যন্ত্রণা এবং নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়, তখন আমরা এর সমাধানে ফ্লাইওভার নির্মাণ করছি। আমরা হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভার নির্মাণ করছি। এরইমধ্যে অনেকগুলো ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং সেই ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। এরই মাঝে ঢাকা শহরে নির্মিত হয়েছে আটটি ফ্লাইওভার। এসব হচ্ছে মহাখালী ফ্লাইওভার ১ দশমিক ১২ কিলোমিটার, খিলগাঁও ফ্লাইওভার ১ দশমিক ৯, বিজয় সরণি-তেজগাঁও লিংক রোড ফ্লাইওভার শূন্য দশমিক ৬৭, বনানী ফ্লাইওভার শূন্য দশমিক ৮১, মিরপুর এয়ারপোর্ট রোড ১ দশমিক ৯, কুড়িল ফ্লাইওভার ৩ দশমিক ১, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার ১১ দশমিক ৭ এবং মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভার ৮ দশমিক ৭ কিলোমিটার। একইভাবে চট্টগ্রাম শহরেও তিনটি ফ্লাইওভার নির্মিত হয়েছে। বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার ১ দশমিক ৩৩, কদমতলী ফ্লাইওভার ১ দশমিক ১০ ও আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার ৫ দশমিক ২ কিলোমিটার। এসব ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে যান চলাচল সত্ত্বেও শহরের যানজট কিন্তু খুব একটা কমেনি। এখনো যানজট লেগেই আছে, এমনকি কোনো কোনো ফ্লাইওভারের ওপরও মাঝে মধ্যে যানজটের সৃষ্টি হয়। কিন্তু কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ এ ফ্লাইওভারের পরিবর্তে ক্রসিং পয়েন্টে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি ওভারব্রিজ বিদ্যমান যানজট নিরসনে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্মাণ খরচও কম হবে, নির্মাণ সময় কম লাগবে এবং ফলাফলও অনেক বেশি পাওয়া যাবে। সড়ক বরাবর দীর্ঘ ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিবর্তে শুধু সড়কের ক্রসিং পয়েন্টগুলোয় যদি আমরা প্রয়োজন অনুসারে একটি অথবা দুটি ওভারব্রিজ নির্মাণ করি তাহলে কিন্তু যানজট থাকবে না। একইভাবে রেলক্রসিং পয়েন্টগুলোয় যদি ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি ওভারব্রিজ নির্মাণ করি, তাহলে কিন্তু রেল চলাচলও স্বাভাবিক থাকবে এবং রেল চলাচলের জন্য রাস্তার অন্যান্য যানবাহনের গতিরোধ করতে হবে না। ফলে রেল চলাচলের কারণে কোনো যানজটের সৃষ্টি হবে না। তাছাড়া এসব ওভারব্রিজ কিন্তু স্বল্প খরচে ও স্বল্প সময়ে নির্মাণ করা যাবে। ফলে দ্রুততম সময়ে নগরবাসীর জীবনে যানজটমুক্ত যাতায়াত উপহার দেয়া যাবে।
যানজট নিরসনের উপায় নিয়েই যখন আজকের আলোচনা, সুতরাং প্রথমেই আমাদের জানা দরকার যানজট কেন হয় এবং যানজটের প্রকৃত কারণগুলো কী কী? মূলত যানজটের প্রকৃত কারণ হচ্ছে ক্রসিং পয়েন্টে যানবাহনের অবাধ যাতায়াতে প্রতিবন্ধকতা। একইভাবে ক্রসিং পয়েন্টে অবাধে দিক পরিবর্তনের প্রতিবন্ধকতাও যানজট সৃষ্টির আরেকটি প্রধান কারণ। একটি সোজা রাস্তায় যখন গাড়ি চলাচল করে, তখন রাস্তা যতই অপ্রশস্ত হোক না কেন যানজটের কিন্তু সৃষ্টি হয় না। একইভাবে সোজা রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা যত বেশিই হোক না কেন, যানজট কিন্তু সৃষ্টি হয় না। কারণ সোজা রাস্তায় গাড়ি কেবল সামনের দিকেই চলে। সুতরাং এখানে গাড়ি চলার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় না। ফলে যানজটও সৃষ্টি হয় না। কিন্তু একটি গাড়ি যখন তার সোজা রাস্তায় চলার একপর্যায়ে ক্রসিং পয়েন্ট বা চৌরাস্তায় পৌঁছে এবং সেখান থেকে সোজাসুজি সামনের দিকে, ডানে অথবা বাঁয়ে কোনো রাস্তায় চলাচল শুরু করতে চায়, তখন সে তার প্রয়োজনীয় রাস্তায় সহজে প্রবেশ করতে পারে না। কারণ ওই রাস্তাটি তখন ব্যস্ত থাকে। ফলে যানবাহনটিকে অপেক্ষা করতে হয় এবং ওখান থেকেই যানজটের শুরু হয়। অর্থাৎ গাড়িটি ক্রসিং পয়েন্টটি বিনা বাধায় অতিক্রম করতে পারে না এবং গাড়িটি অবাধে দিক পরিবর্তন করতে পারে না বিধায় তাকে অপেক্ষা করতে হয় এবং যানজটের সৃষ্টি হয়। কারণ পূর্ব-পশ্চিম রাস্তা বরাবর চলাচল করা গাড়িগুলো যখন ক্রসিং পয়েন্টে আসে, তখন দেখা গেল উত্তর-দক্ষিণ রাস্তা বরাবর চলাচলকারী গাড়িগুলো ক্রসিং পয়েন্ট অতিক্রম করছে। ফলে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর চলাচলকারী গাড়িগুলোকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। আবার উত্তর-দক্ষিণ রাস্তা বরাবর চলাচলকারী গাড়িগুলো যখন ক্রসিং পয়েন্টে আসে, তখন দেখা গেল পূর্ব-পশ্চিম বরাবর চলাচলকারী গাড়িগুলো ক্রসিং পয়েন্ট অতিক্রম করছে। ফলে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর চলাচলকারী গাড়িগুলোকে অপেক্ষা করতে হয়। অর্থাৎ যেকোনো দিকে চলাচলকারী গাড়িগুলোকে তার বিপরীত রাস্তায় চলাচলকারী গাড়িগুলো ক্রসিং পয়েন্ট পার না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এ অপেক্ষার সময় যত কম, যানজটও তত কম। আর অপেক্ষার সময় যত বেশি, যানজটও তত দীর্ঘ হয়। আর যে ক্রসিং পয়েন্টে গাড়ির সংখ্যা কম, সেখানে ব্যস্ততাও কম, স্বাভাবিকভাবে যানজটও কম। অন্যদিকে যে ক্রসিং পয়েন্টে গাড়ির সংখ্যা বেশি, সেই ক্রসিং পয়েন্টে ব্যস্ততাও বেশি এবং যানজটও বেশি। সুতরাং ক্রসিং পয়েন্টে গাড়ির অবাধ যাতায়াত ও দিক পরিবর্তনে প্রতিবন্ধকতাই যানজট সৃষ্টির মূল কারণ।
বর্তমানে যেসব ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে, তা কিন্তু কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ। আবার এসব ফ্লাইওভার বরাবর নিচের রাস্তাটিতে ফ্লাইওভারের পিলারের জন্য যান চলাচল করতে পারে না। ফলে যেই রাস্তার ওপর ফ্লাইওভার নির্মিত হয়, সেই রাস্তায় একটি বিরাট অংশে গাড়ি চলাচল করতে পারে না। ফ্লাইওভার নির্মাণের কারণে রাস্তার ব্যবহার উপযোগিতা কমে যায়। ফলে যানজট নিরসনের জন্য কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা যদি শুধু ক্রসিং পয়েন্ট বা চৌরাস্তার মিলিত স্থানে স্বল্প দৈর্ঘ্যরে ওভারব্রিজ নির্মাণ করি, তাহলে কিন্তু ফ্লাইওভারবিহীন রাস্তার পুরোটাই গাড়ি চলাচলের জন্য ব্যবহার করা যাবে। এ অবস্থায় সহজেই গাড়িগুলো ওভারব্রিজ দিয়ে ক্রসিং পয়েন্ট পার হতে পারবে এবং বিনা বাধায় ডানে-বামে দিক পরিবর্তন করতে পারবে। বর্তমানে আমরা যেসব ফ্লাইওভার নির্মাণ করছি, সেগুলোর অধিকাংশই কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ বিধায় এর নির্মাণ খরচও বেশি, নির্মাণের সময়ও বেশি এবং এসবের মেইনটেন্যান্স খরচও বেশি। কিন্তু আমরা যদি সড়ক বরাবর কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারের পরিবর্তে শুধু ক্রসিং পয়েন্ট বরাবর ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট উত্তর-দক্ষিণ এবং পূর্ব-পশ্চিম বরাবর ওভারব্রিজ নির্মাণ করি, তাহলে কিন্তু সহজেই গাড়িগুলো ক্রসিং পয়েন্ট পাড়ি দিতে পারবে। ফলে যানজট দূর হবে এবং এটাই কিন্তু আমাদের মূল লক্ষ্য। আর এ ক্ষেত্রে যেহেতু ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট ওভারব্রিজ তৈরি করব, সেহেতু এর নির্মাণ খরচও কম, নির্মাণের সময়ও কম এবং এসব ওভারব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণ খরচও কম। এবার যে ওভারব্রিজটি নির্মাণ করব, সেটার আকার-আকৃতির একটি বিবরণ দিচ্ছি। একটি রাস্তার প্রশস্ততা যদি ২০ মিটার হয়ে থাকে, তাহলে সেক্ষেত্রে রাস্তা বরাবর উপরিভাগে ওভারব্রিজের দৈর্ঘ্য হবে কমপক্ষে ২০ মিটার আর উচ্চতা হবে ৬ মিটার। অর্থাৎ ওভারব্রিজের নিচভাগ এবং রাস্তার উপরিভাগের মধ্যকার গ্যাপ হবে ৬ মিটার। আর ওভারব্রিজের দুপাশে ওভারব্রিজে ওঠানামার জন্য যে সংযোগ রাস্তা তৈরি করব, সেটার দৈর্ঘ্য হবে প্রতি প্রান্তে ৯০ মিটার। এ ছাড়া রাস্তার প্রশস্ততার ওপর ভিত্তি করে ওভারব্রিজের দৈর্ঘ্য ছোট-বড় হতে পারে। এদিকে এ ওভারব্রিজ কিন্তু আমরা স্টিল স্ট্রাকটার দিয়েও তৈরি করতে পারি। পৃথিবীর বহু দেশে স্টিল স্ট্রাকচারের ব্রিজ রয়েছে এবং বর্তমানে বহু হাইরাইজ বিল্ডিং স্টিল স্টাকচার দিয়ে তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিত কালুরঘাট সেতু কিন্তু স্টিল স্ট্রাকচার দিয়েই তৈরি। ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ১৯১০ সালে নির্মাণ শুরু হয় এবং ১৯১৫ সালে এর ওপর দিয়ে রেল যোগাযোগ শুরু হয়। এরইমধ্যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ তার যাত্রার ১০২ বছর পূর্ণ করেছে এবং এখনো অব্যাহতভাবে সেবা দিয়ে যাছে। অন্যদিকে ২৪০ মিটার দীর্ঘ কালুরঘাট সেতুটিও স্টিল স্ট্রাকচার দিয়ে তৈরি। এটি ১৯৩০ সালে নির্মিত হয়। ১৯৩১ সাল থেকে এটির ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল করছে এবং ১৯৬২ সাল থেকে এর ওপর দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল করছে। আজ থেকে ১০৩ বছর আগে স্টিল স্ট্রাকচার দিয়ে নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং ৮৭ বছর আগে নির্মিত কালুরঘাট ব্রিজ যেহেতু এখনো টিকে আছে, অতএব ওভারব্রিজগুলো অবশ্যই স্ট্রিল স্টাকচার দিয়ে নির্মাণ করা যাবে। আর ওভারব্রিজ তো রাস্তার ওপর একটি সেতুই। অন্যদিকে বর্তমানে প্রযুক্তি তো ১০০ বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। সুতরাং ওভারব্রিজগুলো স্টিল স্ট্রাকচার দিয়ে তৈরি করুন। এতে ওভারব্রিজ নির্মাণে সময় কম লাগবে, ব্রিজের ওজন কম হবে। আজ থেকে ১০০ বছর বা তারও বেশি সময় পরে এ ওভারব্রিজগুলো যখন অপেক্ষাকৃত ব্যবহারের অনুপযোগী হবে, তখন সহজেই স্টিল স্ট্রাকচারে নির্মিত এ ওভারব্রিজ খুলে ফেলা যাবে এবং নতুন স্টিল স্ট্রাকচার দিয়ে পুনরায় নতুন ওভারব্রিজ নির্মাণ করা যাবে। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানিয়ে বলছি, আপনারা আমার এ প্রস্তাবটি গ্রহণ করুন এবং বাস্তবায়ন করুন। পীরক্ষামূলকভাবে অন্তত একটি চৌরাস্তায় এটি বাস্তবায়ন করুন। আমি নিশ্চিত এর মাধ্যমে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সর্বত্রই যানজট কমে আসবে। ফলে উপকৃত হবে নগরবাসীসহ দেশের আপামর জনতা এবং এর মাধ্যমে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে দেশ।

লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2017 bnewsbd24.Com
Design & Developed BY Md Taher